মমতার গলার কাঁটা হয়ে ভোটের সাত দিন আগে দল ছাড়লেন বিদায়ী বিধায়ক
মেলবোর্ন, ১৭ এপ্রিল- সিপিআইএমের বিরুদ্ধে জিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন- সেইবারও আব্দুর রাজ্জাক মন্ডলকে হারাতে পারেনি তার দল তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১১ সালে…
মেলবোর্ন, ১৬ এপ্রিল- ভারতে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করার প্রস্তাবকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংসদ সদস্যদের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খসড়া বিল উপস্থাপনের পর এ নিয়ে আলোচনা করতে বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছে, যা ১৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা। এর মধ্যে লোকসভার আসন সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নারী সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রস্তাব দুটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, কারণ এগুলো ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রস্তাবসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খসড়া বিল ভারতের সংসদ সদস্যদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেগুলো হলো—
*কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন সংশোধনী বিল ২০২৬
*সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল ২০২৬
*সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন সংশোধনী বিল ২০২৬
এই বিলগুলো নিয়ে আলোচনা করতে ১৬ এপ্রিল থেকে বিশেষ সংসদ অধিবেশন ডাকা হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই তিনটি বিল একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে ভারতের সংসদীয় কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে দুইটি বিষয়—লোকসভার আসন বৃদ্ধি এবং নারীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ। এই দুটি প্রস্তাবকে ঘিরে যেমন সমর্থন রয়েছে, তেমনি তীব্র বিরোধিতাও তৈরি হয়েছে।
লোকসভার আসন সংখ্যা কীভাবে ৮৫০ হবে?
প্রস্তাব অনুযায়ী, লোকসভার মোট আসন সংখ্যা ৮৫০ করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে—
*৮১৫টি আসন থাকবে বিভিন্ন রাজ্যের জন্য
*৩৫টি আসন থাকবে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর জন্য
বর্তমানে ভারতের লোকসভায় ৫৪৩ জন সদস্য রয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ সীমা ৫৫০ ধরা থাকলেও বাস্তবে সেই সংখ্যা বাড়ানো হয়নি কয়েক দশক ধরে।
১৯৭৬ সাল থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লোকসভার আসন সংখ্যা স্থির করে রাখা হয়। সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি ছিল ১৯৭১ সালের আদমশুমারি। অর্থাৎ তখনকার জনসংখ্যাকে ভিত্তি ধরেই আসন বণ্টন স্থগিত রাখা হয়েছিল, যাতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে রাজনৈতিক ভারসাম্য হঠাৎ বদলে না যায়।
নতুন প্রস্তাবে সেই ‘ফ্রিজ’ তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে সর্বশেষ আদমশুমারির ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস করা হবে। বর্তমানে ভারতের সর্বশেষ আদমশুমারি ২০১১ সালের, ফলে সেটিই প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
ডিলিমিটেশন কী এবং কেন এত বিতর্ক?
ডিলিমিটেশন বা সীমানা পুনর্নির্ধারণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংসদীয় আসনের সংখ্যা ও সীমানা পুনঃনির্ধারণ করা হয়।
নতুন বিল অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে একটি ডিলিমিটেশন কমিশন গঠন করা হবে। এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর নির্বাচন কমিশনাররা থাকবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভবিষ্যতে কোন আদমশুমারির ভিত্তিতে ডিলিমিটেশন হবে তা সংসদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটেই নির্ধারণ করা যাবে। আগে এই ধরনের পরিবর্তনের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হতো, যার জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার ছিল।
এই পরিবর্তনকেই অনেকেই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর উদ্বেগ কেন বাড়ছে?
ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার একরকম নয়। এখানেই মূল রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্র।
দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো যেমন তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা—দীর্ঘদিন ধরে পরিবার পরিকল্পনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করেছে। ফলে সেখানে জন্মহার কমেছে এবং জনসংখ্যা স্থিতিশীল বা তুলনামূলকভাবে কমেছে।
অন্যদিকে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলো উত্তর প্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশসহ কিছু হিন্দিভাষী রাজ্যে—জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি।
যদি জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন পুনর্বণ্টন করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই—
*উত্তর ভারতের আসন সংখ্যা বাড়বে
*দক্ষিণ ভারতের আসন সংখ্যা কমে যাবে বা অনুপাত কমে যাবে
দক্ষিণী রাজ্যগুলোর অভিযোগ, তারা পরিবার পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করেও এখন রাজনৈতিকভাবে ‘শাস্তি’ পাচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: কেন্দ্র বনাম রাজ্য দ্বন্দ্ব
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন এই প্রস্তাবকে সরাসরি গণতন্ত্রের ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন। তার অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত এগিয়ে নিচ্ছে।
তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডিও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোকে একজোট হয়ে এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলও এই প্রস্তাবের সমালোচনা করেছে এবং একে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উদ্যোগ হিসেবে দেখছে।
বিজেপির লাভের রাজনীতি কি?
বিরোধীদের একটি বড় অংশের দাবি, এই ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্য রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে।
কারণ উত্তর ভারতের যেসব রাজ্যে জনসংখ্যা বেশি, সেখানে বিজেপির শক্ত অবস্থান রয়েছে। আসন সংখ্যা বাড়লে সেই রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবও সংসদে বাড়বে।
তবে কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, এই প্রক্রিয়া কোনো একটি দল বা রাজ্যের জন্য নয়, বরং জনসংখ্যাভিত্তিক ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য।
তবুও বিলের ভাষায় রাজ্যগুলোর বর্তমান প্রতিনিধিত্ব অপরিবর্তিত রাখার বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা না থাকায় সন্দেহ বাড়ছে।
নারী সংরক্ষণ: দীর্ঘদিনের দাবি, নতুন বিতর্ক
একই প্যাকেজের অংশ হিসেবে নারীদের জন্য সংসদ ও বিধানসভায় এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে।
২০২৩ সালে পাস হওয়া নারী শক্তি বন্দন আইনে এই সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল। তবে সেটি বাস্তবায়নের শর্ত ছিল আদমশুমারি ও ডিলিমিটেশন সম্পন্ন হওয়া।
নতুন প্রস্তাবে সেই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত করার কথা বলা হয়েছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, নারী সংরক্ষণকে সামনে রেখে আসল উদ্দেশ্য হলো ডিলিমিটেশন কার্যকর করা। বর্তমানে লোকসভায় নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র প্রায় ১৪ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। ফলে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের।
তবে বাস্তবায়নের সময় এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনগুলো ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
একজন বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, যদি নতুন কাঠামোতে মাত্র কয়েক শতাংশ ভোটের পরিবর্তন হয়, সেটিই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে নারী ভোটারদের প্রভাব বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দল ভবিষ্যৎ নির্বাচনে অতিরিক্ত সুবিধা নিতে চাইছে।
লোকসভার আসন বৃদ্ধি, ডিলিমিটেশন এবং নারী সংরক্ষণ—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় মোড় তৈরি করছে। একদিকে এটি প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে এটি রাজ্যগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই বিলগুলো পাস হলে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে তার আগেই রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বাস্তব সম্ভাবনা।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au