বিশ্ব

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ যেভাবে চাপে ফেলেছে ট্রাম্পকে

সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে রিপাবলিকানদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কিছুটা কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

  • 7:59 pm - April 18, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৭২ বার
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ,ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৮ এপ্রিল- ইরানকে ঘিরে শক্ত অবস্থান নিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এক ভিন্ন বাস্তবতায় পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে জ্বালানি বাজার, মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। এর ফলে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ, আর সেটিই এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে সামনে আসছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা হুমকির কথা উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর সামরিক হামলা শুরু করে। শুরুতে কঠোর অবস্থান নিয়ে দ্রুত ফল আনার চেষ্টা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি এত সহজ হয়নি। ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, বরং পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তারা এমন কিছু কৌশল গ্রহণ করেছে, যা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সামরিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়লেও তারা কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। যদিও পরবর্তীতে ইরান সাময়িকভাবে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয়, তবুও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ওই তেলের ওপর নির্ভরশীল না হলেও বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর পড়েছে। পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণে অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ইতোমধ্যে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে রিপাবলিকানদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কিছুটা কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।

নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প। ছবিঃ সংগৃহীত

এ পরিস্থিতি ইরানের নেতৃত্বও বুঝতে পেরেছে। তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণকে একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে আনতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যেমন চীন ও রাশিয়াও এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাচ্ছে—ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হলেও, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে তিনি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প অর্থনৈতিক প্রভাবকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে উঠেছে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কারণ সার পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে জেট জ্বালানির দাম বাড়ায় বিমান ভাড়াও বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

এই চাপের মধ্যেই গত ৮ এপ্রিল ট্রাম্প আকস্মিকভাবে সামরিক হামলা থেকে সরে এসে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করেন। ধারণা করা হচ্ছে, আর্থিক বাজারের অস্থিরতা এবং তার রাজনৈতিক সমর্থকদের একটি অংশের অসন্তোষ এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সেটি কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ট্রাম্পের সামনে এখন কয়েকটি সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন, যুদ্ধবিরতি বাড়াতে পারেন অথবা আবার সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন। তবে তিনি দাবি করছেন, একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং সেটি তার শর্ত অনুযায়ীই হবে। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, এখনও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প । ছবিঃ সংগৃহীত

এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া। তবে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে চাইছে, কিন্তু এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনও ঐকমত্য হয়নি।

যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের জনগণকে তাদের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানালেও তার কোনো বাস্তব প্রভাব দেখা যায়নি। বরং এই অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশ মনে করছে, তাদের সঙ্গে যথাযথ পরামর্শ না করেই এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে তাদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো ক্ষুব্ধ, কারণ তারা এমন একটি যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ বহন করছে, যার সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও দ্রুত এই যুদ্ধের অবসান চায়। তবে তারা আশঙ্কা করছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছে যায়, তাহলে অঞ্চলটি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে সব সমস্যা সমাধান করা যায় না। অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক প্রভাব এখন বড় নির্ধারক হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের জন্য এই যুদ্ধ এখন আর কেবল কৌশলগত বা সামরিক বিষয় নয়, বরং এটি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।

সূত্রঃ রয়টার্স

এই শাখার আরও খবর

ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নাকচ, ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে অনড় পোশাকশ্রমিকেরা

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলনরত পোশাকশ্রমিকেরা তাঁদের আন্দোলনে রাজনৈতিক উসকানি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নাকচ করেছেন। তাঁদের দাবি, কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্ররোচনায় নয়,…

মিরপুরের হতাশা পেছনে ফেলে সিলেটে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ

সিলেটের মাঠ কি বাংলাদেশের জন্য পয়া? পরিসংখ্যান বলছে, উত্তরটা সহজ নয়। এই মাঠে এখন পর্যন্ত ছয়টি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। জয় ও পরাজয় সমান তিনটি করে।…

প্রাণীর সঙ্গে যৌনাচার, জামায়াত সমর্থক শিক্ষক রাইয়ান বাতেন গ্রেপ্তার

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় প্রাণীর সঙ্গে যৌন কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক রাইয়ান আবদুল বাতেন। বুধবার (৪ নভেম্বর) বিষয়টি জানাজানি হলে এ নিয়ে ব্যাপক…

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ১৬ আসনের মধ্যে ১২টিতে ডেমোক্র্যাটদের জয়

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ১৬টি আসনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ১২টি আসনে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি…

যুক্তরাষ্ট্রের চার অঙ্গরাজ্যে প্রথমবারের মতো নারী গভর্নর পেতে পারে ৪ অঙ্গরাজ্য

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নতুন ইতিহাস গড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে চারটি অঙ্গরাজ্যে। এবারের নির্বাচনে জর্জিয়া, মিনেসোটা, টেনেসি ও ওহাইও প্রথমবারের মতো নারী গভর্নর পেতে পারে। এসব…

কারাগার থেকে স্বেচ্ছানির্বাসন, রণেশ দাশগুপ্তের বিপ্লবী জীবন

ভাস্কর দত্ত :  আজ ৪ নভেম্বর, কিংবদন্তি সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বিপ্লবী রণেশ দাশগুপ্তের মৃত্যুবার্ষিকী। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে কলকাতার স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবন—সংগ্রামই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au