বিশ্ব

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ যেভাবে চাপে ফেলেছে ট্রাম্পকে

সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে রিপাবলিকানদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কিছুটা কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

  • 7:59 pm - April 18, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৩৩ বার
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ,ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৮ এপ্রিল- ইরানকে ঘিরে শক্ত অবস্থান নিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এক ভিন্ন বাস্তবতায় পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে জ্বালানি বাজার, মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। এর ফলে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ, আর সেটিই এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে সামনে আসছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা হুমকির কথা উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর সামরিক হামলা শুরু করে। শুরুতে কঠোর অবস্থান নিয়ে দ্রুত ফল আনার চেষ্টা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি এত সহজ হয়নি। ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, বরং পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তারা এমন কিছু কৌশল গ্রহণ করেছে, যা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সামরিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়লেও তারা কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। যদিও পরবর্তীতে ইরান সাময়িকভাবে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয়, তবুও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ওই তেলের ওপর নির্ভরশীল না হলেও বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর পড়েছে। পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণে অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ইতোমধ্যে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে রিপাবলিকানদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কিছুটা কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।

নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প। ছবিঃ সংগৃহীত

এ পরিস্থিতি ইরানের নেতৃত্বও বুঝতে পেরেছে। তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণকে একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে আনতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যেমন চীন ও রাশিয়াও এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাচ্ছে—ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হলেও, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে তিনি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প অর্থনৈতিক প্রভাবকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে উঠেছে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কারণ সার পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে জেট জ্বালানির দাম বাড়ায় বিমান ভাড়াও বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

এই চাপের মধ্যেই গত ৮ এপ্রিল ট্রাম্প আকস্মিকভাবে সামরিক হামলা থেকে সরে এসে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করেন। ধারণা করা হচ্ছে, আর্থিক বাজারের অস্থিরতা এবং তার রাজনৈতিক সমর্থকদের একটি অংশের অসন্তোষ এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সেটি কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ট্রাম্পের সামনে এখন কয়েকটি সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন, যুদ্ধবিরতি বাড়াতে পারেন অথবা আবার সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন। তবে তিনি দাবি করছেন, একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং সেটি তার শর্ত অনুযায়ীই হবে। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, এখনও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প । ছবিঃ সংগৃহীত

এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া। তবে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে চাইছে, কিন্তু এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনও ঐকমত্য হয়নি।

যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের জনগণকে তাদের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানালেও তার কোনো বাস্তব প্রভাব দেখা যায়নি। বরং এই অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশ মনে করছে, তাদের সঙ্গে যথাযথ পরামর্শ না করেই এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে তাদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো ক্ষুব্ধ, কারণ তারা এমন একটি যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ বহন করছে, যার সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও দ্রুত এই যুদ্ধের অবসান চায়। তবে তারা আশঙ্কা করছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছে যায়, তাহলে অঞ্চলটি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে সব সমস্যা সমাধান করা যায় না। অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক প্রভাব এখন বড় নির্ধারক হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের জন্য এই যুদ্ধ এখন আর কেবল কৌশলগত বা সামরিক বিষয় নয়, বরং এটি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।

সূত্রঃ রয়টার্স

এই শাখার আরও খবর

‘ঘৃণা নয়, শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেমই আরএসএসের ভিত্তি’: লন্ডনে মোহন ভাগবত

লন্ডনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) কাজের মূল দর্শন তুলে ধরে সংগঠনটির সরসংঘচালক মোহন ভাগবত বলেছেন, তীব্র ঘৃণা নয়, ‘শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেম’ই আরএসএসের কর্মকাণ্ডের ভিত্তি। পারস্পরিক…

নিখোঁজের ৮ ঘণ্টা পর গর্ত থেকে শিশু বিথি রায়ের মরদেহ উদ্ধার

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার প্রায় আট ঘণ্টা পর বিথি রায় নামে ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার রাত ৮টার দিকে…

যুক্তরাজ্যে ফিরলেও রাজপরিবারের দায়িত্বে ফিরছেন না হ্যারি-মেগান

যুক্তরাজ্যে প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর স্ত্রী মেগান মার্কেলের ফেরার খবরে রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই হ্যারি ও মেগানের…

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর স্বাধীন নজরদারি প্রতিষ্ঠান গঠনের আহ্বান ফলকার টুর্কের

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি এবং তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার…

গণপতি পরিবারের ছয়-সাত ভরি স্বর্ণ গেল কোথায়? উদ্ধার সম্ভব নয় কেন বলছে পুলিশ?

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো, হত্যার…

ডেঙ্গুতে ৪২ হাজারের বেশি আক্রান্ত, মৃত্যু ১১৭

বাংলাদেশে চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৪২ হাজার ৫৯০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au