বাংলাদেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা , ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩০ এপ্রিল- বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে একটি গোপন বিদেশি ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে দাবি করা হচ্ছে, বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে ঘিরে একটি পরিকল্পিত অপারেশন পরিচালনার চেষ্টা চলছে, যার সঙ্গে তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে।
একাধিক সূত্র জানায়, তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ভারতে সক্রিয় রয়েছে এবং এই অপারেশনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভারতে অবস্থানরত এক বাংলাদেশি নাগরিক কাজ করছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মো. জুবায়েদ জিম নামের ওই ব্যক্তি বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী। তিনি বৈধ ভিসায় ভারতে প্রবেশ করলেও তার ভিসার মেয়াদ ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি শেষ হয়েছে। এরপরও তিনি অবৈধভাবে সেখানে অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, জিম নিজেকে শেখ হাসিনার ‘প্রটোকল কর্মকর্তা’ হিসেবে পরিচয় দেন এবং কখনো কখনো নিজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক দাবি করেন। তবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি নৌবাহিনীর ক্যাডেট থাকা অবস্থায় বহিষ্কৃত হন এবং তার এমন কোনো সরকারি পরিচয় নেই।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, তার স্ত্রীর মাধ্যমে তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন হয়। গত বছর তার স্ত্রী একাধিকবার তুরস্ক সফর করেন এবং সেসব সফরের সময় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে। এরপর থেকেই জিম শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত তথ্য, যোগাযোগ ও অবস্থান সংক্রান্ত গোপন তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদানে যুক্ত হন বলে দাবি করা হচ্ছে।
সূত্রগুলোর মতে, এই কর্মকাণ্ড শুধু নজরদারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করার পরিকল্পনাও থাকতে পারে, যাতে শেখ হাসিনার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে এবং এর দায় ভারতের ওপর চাপানো যায়। যদি এমন পরিকল্পনা সত্যি হয়, তবে তা আঞ্চলিক রাজনীতিতে বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে একটি যোগাযোগের সূত্রও থাকতে পারে। দাবি করা হচ্ছে, একটি চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বহুমূল্য টেলিযোগাযোগ চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনায় জিম মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং রাজনৈতিক বিভাজন তৈরির প্রচেষ্টায়ও তিনি জড়িত থাকতে পারেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও বিভ্রান্তি ও ভয় তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নরওয়ে, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং দলের ভেতরে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভারতে অবস্থানরত কিছু নেতাকর্মীর কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা এবং ব্যক্তিগত নথিপত্র জব্দ করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
ভুল তথ্য ছড়ানোর অংশ হিসেবে কয়েক মাস আগে একটি আফ্রিকান নারীর ছবি প্রচার করে তাকে সায়মা ওয়াজেদের মেয়ে বলে দাবি করা হয়, যা পরে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়। একই সঙ্গে সায়মা ওয়াজেদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ওয়াইজ-গভ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আসলে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের জন্য ফিশিং কৌশল হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্ক ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিভিন্ন মতাদর্শভিত্তিক গোষ্ঠীর মধ্যে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট এই ধরনের কার্যক্রমের জন্য একটি সংবেদনশীল পরিবেশ তৈরি করে।
ভারতের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কারণ এ ধরনের গোয়েন্দা কার্যক্রম শুধু সামরিক বা সরকারি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নাগরিক সমাজ, প্রবাসী নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও বিস্তৃত হচ্ছে।
ভারতের তদন্ত সংস্থা জাতীয় তদন্ত সংস্থা ইতোমধ্যে বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখছে এবং এটি বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বড় কৌশলগত কাঠামোর অংশ, যেখানে বিভিন্ন ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। একজনকে গ্রেপ্তার করা গেলেও পুরো নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে।
সার্বিকভাবে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে এই অভিযোগগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।
সূত্রঃ দ্য নিউ দিল্লি পোস্ট