এক ইনজেকশনেই নির্মূল হবে ক্যানসারের টিউমার
মেলবোর্ন, ১ জুন- ক্যানসার চিকিৎসায় বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখাচ্ছে নতুন একটি পরীক্ষামূলক ইনজেকশন। আন্তর্জাতিক এক ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, ‘অ্যামিভান্টাম্যাব’ নামের এই ওষুধ কিছু…
মেলবোর্ন, ৩১ মে:
“তোমাদের মস্তিষ্কে জেগে ওঠা প্রশ্নগুলো প্রকাশ কর। নইলে সেগুলো তোমাদের ঘুমাতে দেবে না।”
——————————————————————————————————————————————————————————
বিশ্বাসের রং ও গভীরতা বিষয়ে প্রথম ক্লাসের পর আজ আমাদের পরের ক্লাস বা ক্লাস-২ শুরু হচ্ছে। আমরা সকল বন্ধু ক্লাস শুরুর আগেই উপস্থিত হয়েছি। যথারীতি পূর্বের মতো টর্নেডো তিতাস স্যার ও সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার উভয়েই ক্লাসে উপস্থিত রয়েছেন।
টর্নেডো তিতাস স্যার ক্লাস শুরু করলেন—
স্যার দেখলেন যে, প্রথম ক্লাসে যেমন আমিনুল অনুপস্থিত ছিল, তেমনই আজকের ক্লাসে আমিনুলের সঙ্গে ফারুকও অনুপস্থিত আছে। আমিনুল ও ফারুক উভয়ের আসন পাশাপাশি ছিল। কিন্তু আজ সেই দুটি আসনই শূন্য পড়ে আছে। কারণ তারা এখন আমাদের পর্দার আড়ালে চলে গেছে।
টর্নেডো তিতাস স্যার শুরুতেই বললেন,
“আমি তোমাদের নিকট কিছুই গোপন করব না, যাকিছু সত্য রয়েছে, তার সবটুকু সত্য আজ তোমাদের জানিয়ে দেব, যাতে তোমরা জ্ঞানের সাগরে নিশ্চিন্তে সাঁতার কাটতে পারো। মনে রেখো, তোমরা যখন জ্ঞানের সাগরে সাঁতার কাটবে, তখন তোমাদের বিপরীতে সেই সাগরের জলের প্রতিটি বিন্দু তোমাদের চারপাশে তরঙ্গ তৈরি করবে।”
এরপর তিনি আরও বললেন,
“আজ ইশ্বরের চেয়েও পুরাতন সত্য প্রকাশ করব। সুতরাং তোমরা সবাই চেতনাকে জাগ্রত করে রাখো, যাতে তোমাদের চেতনা অন্ধত্বের শৃঙ্খল হতে মুক্তি পেয়ে মুক্ত আকাশে ডানা ছাড়াই উড়তে পারে। মনে রেখো, যেকোনো গোপনীয় বিষয় প্রকাশিত হলে, সেই গোপনীয়তার মৃত্যু ঘটে। তাই আমি যত সত্যই প্রকাশ করি না কেন, সেই সত্যের তরঙ্গে সবাই সাঁতার কাটতে পারবে—এ রূপ প্রত্যাশাও করি না। কারণ একটি বৃক্ষে যতই সেবা-শুশ্রূষা করা হোক না কেন, সব ফুলে কখনোই ফল ধরে না। তাই আমি সবার জন্য লেকচার দিতে আসিনি, এসেছি ঐ কয়েকজন বান্দা-বান্দির জন্য, যারা সর্বদাই হৃদয়ের দরজা উন্মুক্ত রাখে এবং আকাশের রং ও সমুদ্রের তরঙ্গের গতিবিধি জেনে বুঝে সঠিক সময়ে নিজেদের ভাসাতে পারবে।”
এরপর সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার টর্নেডো তিতাস স্যারকে বললেন,
“তিতাস ভাই, আপনি এই যুবক পোলাপানকে এত তাত্ত্বিক জ্ঞান দেবেন না, বরং তাদেরকে মেঘের আড়াল থেকে কিছু আলো দান করেন, কারণ তারা তো এখন নিজেরাই তাত্ত্বিক জ্ঞানে অধিক পারদর্শী। তারা এখন সামান্য কিছু আলোর বিকিরণ পেলেই কালো মেঘের ওপর রংধনু তৈরি করতে সক্ষম।”
এবার টর্নেডো তিতাস স্যার সাম্যসাথী ভৌমিক স্যারকে বললেন, “কিন্তু কীভাবে স্যার?”
সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার বললেন, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পশ্চিমারা ইশ্বরকে প্রকৃতির বাইরে অনেক খুঁজেছিলেন, কিন্তু তারা তা পায়নি। তবে তারা পেয়েছিল ইশ্বরের পরিবর্তে কিছু ধর্মের কঙ্কাল; এরপর তাদের মুষ্টিমেয় জনগণ সেই কঙ্কালের শ্বাস চেপে ধরে হত্যা করেন। অন্যদিকে যারা প্রকৃত ইশ্বরকে খুঁজে পেয়েছিলেন, তারা নিজেরাই ইশ্বরের কঙ্কালে পরিণত হয়েছিলেন। সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ২০২৪ সালের আকস্মিক বন্যার কবলে আক্রান্ত ফেনিসহ বেশ কয়েকটি জেলার অসংখ্য পরিবার—তাদের কিছু পরিবারের বাস্তব ঘটনা তুলে ধরুন।”
টর্নেডো তিতাস স্যার সাম্যসাথী ভৌমিক স্যারকে বললেন, “ওকে স্যার।”
এরপর টর্নেডো তিতাস স্যার বললেন, “আজ তোমাদের একটি সত্য ঘটনা বলব, তোমরা গভীর মনোযোগী হও।”
আমরা সবাই নিশ্চুপ হয়ে স্যারের প্রতি মনোযোগী হলাম।
টর্নেডো তিতাস স্যার শুরু করলেন, “ফেনীর ফুলগাজীতে সিলোনিয়া নদীর উপকূলে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর ছিল। সেখানে একটি মুসলিম প্রতিবন্ধী দম্পতি বাস করতেন। তাদের মধ্যে স্বামীর একটি হাত আর স্ত্রীর একটি পা ছিল না। তারা ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দাম্পত্য জীবনের দীর্ঘ দশ বছর পরে তাদের ঘরে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে যমজ হয়ে এসেছিল। তাদের বয়স পাঁচ বছরের মতো। এই বয়সে বাবা-মায়ের নিকট শিশুদের আবদার একটু বেশি থাকে। তেমনই গত ঈদে মেয়ে শিশুটি বাবার কাছে বায়না করেছিল—ঈদে পোলাও-মাংস খাবে।
কিন্তু বাবা অনেক চেষ্টা করেও সামর্থ্যের অভাবে তা সম্ভব করতে না পেরে দুই সন্তানের জন্য একজোড়া লাল প্যান্ট কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও মেয়েটির কান্না না থামায়, বাবা মেয়েকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন যে, সামনের ঈদে অবশ্যই পোলাও-মাংস খাওয়াবেন। কিন্তু সেই ছোট্ট মেয়েটির স্বপ্ন চিরতরে কেড়ে নিয়েছে আল্লাহ। কারণ এর কিছুদিন পরেই সেই আকস্মিক ভয়াবহ বন্যা সংঘটিত হয়।
হঠাৎ করে রাতের আঁধারে ত্রিপুরার ডুম্বুর জলাধারের বাঁধের স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়। ফলে পানির বিশাল জোয়ার ফেনীর ওপর দিয়ে বিভিন্ন জনপদ ভাসিয়ে হু-হু করে দানবের মতো এই দেশে হামলা করে। ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালীসহ চট্টগ্রামের বেশ কিছু এলাকায় ভয়াবহ আকার ধারণ করে। চারদিকে শুধু মৃত্যুর আর্তনাদ। বাবা ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেই বাঁচাও বাঁচাও করে চিৎকার করতে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মা ঘুম থেকে জেগে উঠে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। তড়িঘড়ি করে সকলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই ঘরটি পানির স্রোতে ভেসে যায়।
মা ছেলেকে নিয়ে অনেক কষ্টে এক পায়ে উঠানের একটি নারিকেল গাছ জড়িয়ে ধরেন। পরে নিজেকে আটকাতে ব্যর্থ হলে নিজের শরীরের পরনের একমাত্র শাড়িটি খুলে গাছটির সঙ্গে ভালোভাবে পেঁচিয়ে ছেলে ও নিজেকে বেঁধে ফেলেন। কিন্তু বাবা এক হাতে মেয়েটিকে নিয়ে কোনো বৃক্ষকে জড়িয়ে ধরতে না পেরে স্রোতের সঙ্গেই সিলোনিয়া নদীতে ভেসে যান। শত শত চিৎকারের মাঝে সেই বাবা ও মেয়ের চিৎকারের শব্দ কয়েক মিনিটেই বিলীন হয়ে যায়। চারদিকে যেমন স্রোতের দাবানল ও মাথার ওপর বৃষ্টি, তেমনই আবার মেঘের গর্জন ও রাতের অন্ধকার। কাঁদতে কাঁদতে মা বস্ত্রহীন শরীরেই আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন।
প্রার্থনায় তিনি বলেন, “হে আল্লাহ, তুমি আমাদের এই জগতে পাঠিয়েছ, এবং তোমার নিকট আমরা পুনরায় ফিরে যাব, তুমিই আমাদের একমাত্র হেফাজতকারী। তুমি আমার পরিবারকে রক্ষা কর। তোমার নিকট এই দুনিয়ার জন্য মানুষ তো কত কিছু চায়! কিন্তু আমি তোমার কাছে এই দুনিয়ার জন্য কখনোই কিছু চাইনি। আজ যখন নয়নের জল, মেঘের বৃষ্টি ও বন্যার স্রোতের পানি আমার উন্মুক্ত দেহের পোশাক হয়েছে, তখন ভিক্ষার থালা হিসেবে আমার সিক্ত দুই হাত তোমার চরণে এগিয়ে দিলাম। হে আল্লাহ, তুমি অসীম করুণাময়। তোমার দয়ায় আমার পরিবারকে রক্ষা কর। তুমি আমার পরিবারকে রক্ষা না করে আমাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিয়ো না।”
এভাবেই প্রার্থনা করতে করতে রাত শেষ হয়ে ভোর হয়।
ততক্ষণে স্রোতের বেগ অনেক হ্রাস পায় এবং পানির উচ্চতাও গলা থেকে কোমর পর্যন্ত নেমে আসে। তবুও কিছু কিছু এলাকায় বন্যার পানি অথই। সকালে চারদিক থেকে মানুষ এগিয়ে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। সিলোনিয়া নদীর ধারে অসংখ্য লাশের সারি দেখা যায়। সেই ছোট্ট ছেলেটিও বাবা ও বোনের খোঁজে সেখানে যায়। কিন্তু বোনের সন্ধান পেলেও বাবার সন্ধান কোনোভাবেই মেলেনি। বোনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে মায়ের কাছে নিয়ে আসে।
ছেলেটি মাকে কাঁদতে কাঁদতে ডাক দিয়ে বলে, “মা! মা! দেখো! গত রাতে আল্লাহ আমার যে বোনকে নিয়ে গিয়েছিল, আজ আল্লাহ তাকে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমার বোন আর কথা বলছে না কেন, মা? মাগো! মা! বোনের কী হয়েছে? মা! দেখো! কীভাবে নতুন প্যান্টটা ভিজে গেছে। গত ঈদে যে লাল প্যান্ট আব্বু কিনে দিয়েছিল, সেটা দেখেই আমি চিনতে পেরেছি। বোনটি গত ঈদে পোলাও-মাংস খেতে চেয়েছিল। কিন্তু পোলাও-মাংস খাওয়া হয়নি। মা! মা! সামনের ঈদে কি বোনের সঙ্গে আমরা সবাই পোলাও-মাংস খাব?”
ততক্ষণে মা অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছেন। এভাবেই হাজারো স্বপ্ন চোখের পলকেই জলে ডুবে গেছে।”
এতক্ষণ আমরা সবাই গভীর মনোযোগ সহকারে সম্পূর্ণ কাহিনি শ্রবণ করলাম। আমাদের সবার চোখেই পানি ছলছল করছে। এরপর আমরা সবাই একটু নড়াচড়া শুরু করি। আমাদের নড়াচড়া বুঝতে পেরে সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার বললেন, “তোমাদের মস্তিষ্কে জেগে ওঠা প্রশ্নগুলো প্রকাশ কর। নইলে সেগুলো তোমাদের ঘুমাতে দেবে না।”
প্রথমেই শরীফ বন্ধু প্রশ্ন করলেন, “স্যার, বিশ্বাস কী? বিশ্বাস ছাড়া মানুষ কি বাঁচতে পারে?”
সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার মৃদু হেসে বললেন, “বিশ্বাস হলো এক ধরনের মানসিক ভরসা বা অন্তর্দৃষ্টি, যা পূর্ণ জ্ঞান না থাকলেও মানুষকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। এটি কেবল অনুভূতি নয়, বরং অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও অনুমানের এক সূক্ষ্ম সমন্বয়।
মানুষ সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস ছাড়া বাঁচতে পারে—এমন বলা ঠিক নয়। কারণ দৈনন্দিন জীবনেই আমরা অসংখ্য অদৃশ্য বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করি। তবে এটাও সত্য, মানুষ জন্মগতভাবে কোনো নির্দিষ্ট বিশ্বাস নিয়ে আসে না। একটি নবজাতক শিশুর চেতনা থাকে নির্মল ও নিরপেক্ষ—সে না বিশ্বাসী, না অবিশ্বাসী।
কিন্তু ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও শিক্ষা তাকে বিশ্বাস গড়ে তুলতে শেখায়। তাই শিশুর সেই স্বচ্ছতা আমাদের শেখায়—বিশ্বাস যেন অন্ধ না হয়, বরং জিজ্ঞাসা ও উপলব্ধির দিকে এগিয়ে যায়।”
এরপর পলাশ বন্ধু বললেন, “স্যার, এখনও পুরোটা বুঝতে পারছি না। আর একটু সহজ করে বলবন?”
স্যার বললেন, “সহজ করে বলি—যেখানে সম্পূর্ণ জ্ঞান নেই, সেখানে বিশ্বাসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ‘বিশ্বাস’ মানে অপ্রমাণিত কিছু অন্ধভাবে মেনে নেওয়া নয়। বরং এটি হলো—অসম্পূর্ণ জ্ঞানের মধ্যে একটি সাময়িক ভরসা।
ধরো, তুমি দূরে কুয়াশার মধ্যে একটি পাহাড় দেখছো। তুমি পুরোটা স্পষ্ট দেখছো না, তবুও জানো কিছু একটা আছে। এই ‘জানা’টাই বিশ্বাস—যা না সম্পূর্ণ জ্ঞান, না সম্পূর্ণ অজ্ঞতা।
তবে মনে রেখো, কোনো কিছু সত্য বা মিথ্যা হবে—তা বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না। সত্য তার নিজের শক্তিতেই সত্য, আর মিথ্যা তার নিজের কারণেই মিথ্যা। বিশ্বাস শুধু আমাদের উপলব্ধির অবস্থানকে নির্দেশ করে, বস্তুর প্রকৃতিকে নয়।
যেমন—কোনো বস্তুতে আধান আছে কি নেই, তা আমাদের বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না; তা নির্ভর করে বাস্তব অবস্থার ওপর। আমরা না জানলে সেটি ‘অজানা’ থাকে, কিন্তু তার প্রকৃতি বদলে যায় না।”
এরপর রানা বন্ধু প্রশ্ন করলেন, “স্যার, তাহলে স্রষ্টার অস্তিত্ব কি বিশ্বাসের বিষয়, না প্রমাণের বিষয়?”
স্যার কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, “খুব সূক্ষ্ম প্রশ্ন।
দেখো, এমন কিছু সত্য আছে যা আমাদের বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না—যেমন তুমি এখানে উপস্থিত, এটি অন্য কেউ অস্বীকার করলেও তোমার অস্তিত্ব বদলে যাবে না। অর্থাৎ, সত্য নিজে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
স্রষ্টার প্রশ্নটিও অনেকটা তেমন—এটি কেবল বিশ্বাসের বিষয় নয়, আবার সরল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রমাণের বিষয়ও নয়। এটি অনুসন্ধান, উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার বিষয়।
অনেকে যুক্তি দিয়ে বলেন—যেহেতু প্রতিটি ঘটনার একটি কারণ থাকে, তাই মহাবিশ্বেরও একটি মূল কারণ থাকা উচিত। এই ধারণা থেকে স্রষ্টার ধারণা আসে। তবে এটিকে সরলভাবে ‘পিতা-মাতা’র সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। কারণ মহাবিশ্বের কারণ মানবজগতের কারণের মতো নাও হতে পারে।
——————————————————————————————————————————————————————————
তাই বলা ভালো—বিশ্বাস এখানে একটি শুরু। যুক্তি তাকে প্রশ্ন করে। অনুসন্ধান তাকে গভীর করে। আর ব্যক্তিগত উপলব্ধি তাকে জীবন্ত করে তোলে। যখন কেউ সত্যকে নিজ অভিজ্ঞতায় স্পর্শ করে, তখন তার কাছে বিশ্বাস আর তর্কের বিষয় থাকে না—তা হয়ে ওঠে নীরব প্রত্যক্ষতা।”
বর্ণা বন্ধু প্রশ্ন করলেন, “স্যার, মানুষ কেন বদলায়? মানুষকে কি বিশ্বাস করা যায়?”
সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার শান্ত কণ্ঠে বললেন, “মানুষ বদলায়—আবার এক অর্থে বদলায় না। বদলায় এই অর্থে যে, সময়, অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও চেতনার বিকাশ মানুষকে রূপান্তরিত করে। তার চিন্তা, মূল্যবোধ, আচরণ—সবই পরিবর্তিত হতে পারে।
আবার ‘বদলায় না’ এই অর্থে যে, মানুষের ভেতরে কিছু মৌলিক প্রবণতা থাকে—যেমন ভালো ও মন্দের সম্ভাবনা—যা সবসময়ই তার মধ্যে উপস্থিত। পরিস্থিতি ও চর্চার উপর নির্ভর করে কখনো ভালো দিক প্রকাশ পায়, কখনো মন্দ দিক।
তাই প্রতিটি মানুষের মধ্যেই সম্ভাবনা দ্বিমুখী—একদিকে উন্নতি, অন্যদিকে অবনতি।
এখন প্রশ্ন—মানুষকে কি বিশ্বাস করা যায়?
বিশ্বাস করা যায়, তবে অন্ধভাবে নয়। মানুষকে তার কথার চেয়ে বেশি তার কাজ, ধারাবাহিকতা ও চরিত্র দিয়ে বুঝতে হয়। যে ব্যক্তি নিজের দুর্বলতাকে চেনে এবং তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তাকে বিশ্বাস করা তুলনামূলক ভাবে নিরাপদ। আর যে নিজের মন্দ প্রবণতাকে অস্বীকার করে, তার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।”
এরপর স্বেচ্ছা বন্ধু প্রশ্ন করলেন, “স্যার, বিশ্বাস ছাড়া কোনো সংসার কি টিকে থাকতে পারে?”
স্যার একটু চিন্তা করে বললেন, “সংসার বা যেকোনো সম্পর্কের ভিত্তি শুধু বিশ্বাস নয়—বরং বিশ্বাস, বোঝাপড়া, দায়িত্ববোধ ও যোগাযোগ—এই চারটির সমন্বয়।
শুধু বিশ্বাস দিয়ে সম্পর্ক টিকে না, আবার বিশ্বাস ছাড়া সম্পর্ক টিকেও না। আমরা অনেক সময় যাকে ‘বিশ্বাস’ বলি, তার ভেতরে আসলে লুকিয়ে থাকে ‘প্রত্যাশা’। আমরা মানুষকে যেমন, তেমন ভাবে না দেখে—যেমন দেখতে চাই, তেমন ভাবে দেখি। আর সেখানেই সমস্যা শুরু হয়।
যখন বাস্তবতা আমাদের সেই কল্পনার সাথে মিলে না, তখন মনে হয় বিশ্বাস ভেঙে গেছে। আসলে ভাঙে আমাদের প্রত্যাশা, মানুষটি নয়। তাই মনে রাখা জরুরি—বিশ্বাস ও প্রত্যাশা এক নয়।
বিশ্বাস হলো—মানুষের বর্তমান আচরণ ও চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে একটি সচেতন আস্থা। আর প্রত্যাশা হলো—আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী অন্যকে দেখতে চাওয়া।
যেখানে প্রত্যাশা অযৌক্তিক ভাবে বেড়ে যায়, সেখানে সম্পর্ক ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। আর ‘বিশ্বাসমুক্ত সম্পর্ক’—এমন ধারণা বাস্তবে সম্ভব নয়। কারণ কোনো না কোনো স্তরে আস্থা ছাড়া সম্পর্ক দাঁড়াতে পারে না। তবে সম্পর্ক এমন হতে পারে, যেখানে বিশ্বাস অন্ধ নয়—বরং সচেতন, নমনীয় এবং বাস্তববোধসম্পন্ন।
সুস্থ সম্পর্কের চিহ্ন হলো—বিশ্বাস থাকবে, কিন্তু প্রশ্ন করার সুযোগও থাকবে; ভরসা থাকবে, কিন্তু অন্ধতা থাকবে না। তখন সম্পর্ক ভাঙে না সহজে, বরং সময়ের সাথে পরিণত হয়।”
সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার বললেন, “আলোচনা অনেক হয়েছে। এবার ক্লাসের কিছু বিরতির প্রয়োজন। আজ এখানেই ক্লাস শেষ করলাম।”
ক্লাস-২ এর প্রথম অংশ এখানেই সমাপ্তি। ক্লাস-২ এর বাকি অংশ শুরু হবে বিরতির পর।
——————————————————————————————————————————————————————————
লেখক: মৌলিক পদার্থ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au