মেলবোর্ন,১০ মে- যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি ঘিরে এশিয়ার দেশগুলো যখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলী সমঝোতায় নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত, তখন সেই প্রতিযোগিতায় কার্যত পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন এশীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি ও কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে শুল্ক চাপ কমানোর চেষ্টা করলেও বাংলাদেশ এখনো স্পষ্ট কোনো সুবিধা আদায় করতে পারেনি।
২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আওতায় আরোপ করা শুল্ককে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলেও পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। আদালতের রায়ের পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ ধারা ব্যবহার করে প্রায় সব দেশের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, যা পরে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়।
এর ফলে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন মোড় নেয়। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায়নি, বরং সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠন, উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ, ট্রান্সশিপমেন্ট বন্ধ এবং এশীয় অর্থনীতিগুলোকে নিজেদের কৌশলগত বলয়ে আরও শক্তভাবে টেনে আনতেই শুল্ককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
মালয়েশিয়া ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি করে ৪৭ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু আদালতের রায়ের পর নতুন শুল্ক কাঠামো চালু হওয়ায় সেই সুবিধা প্রায় অর্থহীন হয়ে পড়ে। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী জোহারি।
ইন্দোনেশিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সমঝোতা করেছিল। পাম অয়েল, কফি, কোকো, রাবার, সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক ছাড় পেলেও আদালতের রায়ের কারণে সেই সুবিধার অনেকটাই অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।
চীনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। আদালতের রায়ে কিছু শুল্ক বাতিল হলেও সেকশন ৩০১ ও ২৩২-এর মতো বিভিন্ন মার্কিন বাণিজ্য আইনের আওতায় এখনো উচ্চ শুল্কের মুখে রয়েছে দেশটি। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে শুল্কের হার অনেক বেশি রয়ে গেছে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া শুল্কের বদলে বিপুল বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার পথ বেছে নেয়। জাপান প্রায় ৫৫০ বিলিয়ন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়া ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পরিকল্পনার ঘোষণা দেয়। তবে এসব চুক্তি নিজ দেশেও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড বড় ধরনের সুবিধা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কাঠামোর কারণে ভিয়েতনামের ৪৬ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডের ৩৬ শতাংশ শুল্ক এক ধাক্কায় কমে যায়। অথচ এই দুই দেশ এখনো চূড়ান্ত বাণিজ্য চুক্তিও করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার দেশগুলো দ্রুত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল বদলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় এগোলেও বাংলাদেশ এখনো কার্যকর অবস্থান নিতে পারেনি। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতায় দেশের রপ্তানি খাত ভবিষ্যতে আরও চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।