ফারাক্কা ব্যারাজ ও সংলগ্ন ফিডার ক্যানাল। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৬ মে- বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর কয়েক মাস বাকি। আগামী ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তি। নতুন করে চুক্তি হবে নাকি আগের চুক্তিই নবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না এলেও দুই দেশ এরই মধ্যে প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেছেন, দুই দেশের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনা শেষে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ ও ভারতের কারিগরি দল ইতোমধ্যে তথ্য সংগ্রহ ও প্রাথমিক পর্যালোচনার কাজ শুরু করেছে। পরে যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন কারিগরি বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পর দুই দেশ আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানাতে পারে।
তবে এর মধ্যেই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে গঙ্গার পানি ভাগাভাগির পদ্ধতি নিয়ে। ভারতের পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে নতুন একটি ফর্মুলার কথা বলা হচ্ছে। বাংলাদেশি পানি বিশেষজ্ঞরা সেই প্রস্তাবকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন।
বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী, গঙ্গায় পানির প্রবাহের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ ও ভারত পানি ভাগাভাগি করে। নদীতে পানির প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমান পানি পাবে। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হলে বাংলাদেশ পাবে ৪০ হাজার কিউসেক পানি এবং বাকি অংশ পাবে ভারত। আর পানির প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক এবং বাকি পানি যাবে বাংলাদেশে।
এখন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতীয় পক্ষ চাইছে ফারাক্কা পয়েন্টে সাম্প্রতিক পানিপ্রবাহকে ভিত্তি ধরে নতুন কাঠামো তৈরি করতে। ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ সম্প্রতি বলেছেন, ১৯৯৬ সালের সময়কার ফর্মুলা এখন আর কার্যকর নাও হতে পারে। তিনি গত কয়েক দশকের পানিপ্রবাহের তথ্য বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে বাংলাদেশের নদী বিশেষজ্ঞ ও যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য আইনুন নিশাত বলছেন, এ ধরনের প্রস্তাব ন্যায্য নয়। তার ভাষায়, গঙ্গা নদী শুধু ফারাক্কার ওপর নির্ভরশীল নয়। ভারতের উজানে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের কারণে ফারাক্কা এলাকায় পানির প্রবাহ কমে যায়। সেই কম প্রবাহকে ভিত্তি করে পানি ভাগাভাগি করলে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি আরও বলেন, আগের চুক্তিতে পুরো নদীর প্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে পানি বণ্টনের বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছিল। তাই নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হলেও সেটি ন্যায্যতা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রিও বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পানি সবসময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি জানান, গঙ্গা চুক্তি নিয়ে যৌথ নদী কমিশন সময়মতো কাজ করবে এবং বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারত আলোচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে।
গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে ভারতের ফারাক্কায় এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ১৯৭৫ সালে বাঁধটি চালু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ অভিযোগ করে আসছে, এর কারণে পদ্মা নদীতে পানিপ্রবাহ কমে গেছে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, নৌপথ ও মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ভারতের দাবি ছিল, কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য গঙ্গার পানি ভাগীরথী নদীতে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এজন্য ফারাক্কা বাঁধের সঙ্গে একটি দীর্ঘ সংযোগ খালও তৈরি করা হয়েছিল।
ফারাক্কা ইস্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৭৬ সালে মাওলানা ভাসানী ফারাক্কার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক লং মার্চ করেছিলেন। পরে দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করে।
কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং উজানে পানি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনের কারণে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞরা ফারাক্কা এলাকায় সরেজমিনে জরিপও চালিয়েছেন। যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে সেই জরিপের তথ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে চুক্তি নবায়নে তেমন অগ্রগতি হয়নি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি আবার সামনে আসে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফরের সময় বলেছিলেন, ন্যায্যতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তিতে নতুন পানি চুক্তি হওয়া উচিত। তার মতে, এই চুক্তিই হবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন পরীক্ষার ক্ষেত্র।
তবে এখন পর্যন্ত দুই দেশের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি, শেষ পর্যন্ত আগের চুক্তি নবায়ন হবে নাকি নতুন কোনো কাঠামোতে পানি ভাগাভাগি হবে। ফলে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দুই দেশের আলোচনা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা