২০০ টাকার লোভে অক্সিজেন মাস্ক বিচ্ছিন্ন, শ্বাসকষ্টে প্রাণ গেল দিপালী সিকদারের
মেলবোর্ন, ১৪ মে- মাত্র ২০০ টাকার বকশিশকে কেন্দ্র করে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক মুমূর্ষু রোগীর অক্সিজেন মাস্ক খুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক হাসপাতাল…
মেলবোর্ন, ১৪ মে- মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতন, স্বাধীনতার পর সমাজের অবহেলা আর দীর্ঘ সংগ্রামের এক জীবন্ত সাক্ষী ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর সেই সংগ্রামী নারী চিরবিদায় নিলেন। মঙ্গলবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান একাত্তরের এই নির্যাতিতা বীর নারী। বুধবার সকালে নিজ গ্রামে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামের বাসিন্দা টেপরী রাণীর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন তিনি। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানেই মঙ্গলবার রাতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
বুধবার সকালে গ্রামের বাড়িতে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করেন স্থানীয় মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্বজনরা। কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো বলিদ্বারা গ্রাম। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায়ের সময় উপস্থিত ছিলেন রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম, রাণীশংকৈল থানার পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম, স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
টেপরী রাণীর জীবন যেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক নীরব দলিল। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। চারদিকে তখন যুদ্ধের ভয়াবহতা। গ্রামজুড়ে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুভয়। সেই সময় স্থানীয় এক রাজাকার টেপরী রাণীকে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে তুলে দিলে পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করা হবে বলে আশ্বাস দেয়।
অসহায় বাবা মধুদাস রায় পরিবারের বাকি সদস্যদের প্রাণ বাঁচানোর আশায় মেয়েকে হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। এরপর দীর্ঘ সাত মাস পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন টেপরী রাণী।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাড়ি ফেরেন তিনি। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলেও তার জীবনের যুদ্ধ থামেনি। সমাজ তাকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি। চারপাশ থেকে অনাগত সন্তান নষ্ট করে ফেলার চাপ আসতে থাকে। সেই কঠিন সময়ে মেয়ের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান তার বাবা। তিনি মেয়েকে বলেছিলেন, “এই সন্তানই হবে তোর বেঁচে থাকার অবলম্বন।”
পরে জন্ম হয় ছেলে সুধীর বর্মনের। কিন্তু স্বাধীন দেশের সমাজও তাদের শান্তিতে থাকতে দেয়নি। ছোটবেলা থেকেই নানা অপমান আর কটূক্তির শিকার হতে হয়েছে সুধীরকে। তাকে ‘পাঞ্জাবির বাচ্চা’ বলে অপমান করা হতো। এখন জীবিকার তাগিদে ভ্যানচালকের কাজ করেন তিনি।
সুধীর বর্মন বলেন, “আমাকে নিয়ে মাকে সারা জীবন অপমান সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু মা কখনও ভেঙে পড়েননি। দেশের জন্য তিনি যে ত্যাগ করেছেন, সেটা কোনোদিন ভোলার নয়।”
দীর্ঘ অবহেলা ও বঞ্চনার পর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে স্বীকৃতি পান টেপরী রাণী। পরের বছর তার জীবনের গল্প প্রকাশ্যে এলে দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়। অনেকেই তখন নতুন করে উপলব্ধি করেন, স্বাধীনতার পেছনে নারীদের ত্যাগ কত গভীর ছিল।
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “টেপরী রাণী শুধু একজন বীরাঙ্গনা নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস ছিলেন। তার জীবনের কষ্ট, ত্যাগ ও সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার মূল্য স্মরণ করিয়ে দেয়।”
রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম বলেন, “রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়েছে। দেশের স্বাধীনতার জন্য তার অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।”
টেপরী রাণীর মৃত্যুতে ঠাকুরগাঁওজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। গ্রামের মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন বীরাঙ্গনা নন, বরং এক সাহসী নারী, যিনি নির্যাতন, অপমান আর দীর্ঘ বঞ্চনার মধ্যেও জীবনযুদ্ধ থামাননি। তার বিদায়ের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি জীবন্ত ইতিহাস নিভে গেল।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au