বাংলাদেশ

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলতে পারে মার্কিন চুক্তি: বিশ্লেষণ

  • 12:40 pm - May 19, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৬ বার
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলতে পারে মার্কিন চুক্তি। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৯ মে- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলো দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ওয়াশিংটনের ওপর আরও নির্ভরশীল করে তুলতে পারে এবং পোশাকশিল্প, বিমান পরিবহন ও প্রতিরক্ষা খাতে আর্থিক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে বলে এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক স্টারে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক সমঝোতা অনেকটাই ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মতো, যেভাবে ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতকে ব্যবহার করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে হওয়া চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। তবে এর শর্ত হিসেবে পোশাক উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ও তন্তু ব্যবহার করতে হবে।

বিশ্লেষণে বলা হয়, এই শর্ত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে ক্রমেই মার্কিন তুলা উৎপাদন, কৃষি ভর্তুকি, বাজার অগ্রাধিকার এবং মূল্যনীতির ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে তা সরাসরি বাংলাদেশের কারখানা, শ্রমিক এবং ব্যাংক ঋণ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা ওই প্রতিবেদনে লিখেছেন, এই ব্যবস্থাটি অনেকটা ঔপনিবেশিক আমলের বাণিজ্যিক ধাঁচের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যখন ভারতকে কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং প্রস্তুত পণ্যের বাজার হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শুল্কমুক্ত সুবিধার বিনিময়ে মার্কিন তুলা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিভিত্তিক ও করপোরেট স্বার্থনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করে ফেলতে পারে।

১৪ মে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি দপ্তরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের মধ্যে “কৌশলগত জ্বালানি সহযোগিতা সমঝোতা স্মারক” সই হয়। ছবিঃ সংগৃহীত

এতে প্রতিরক্ষা খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আধুনিক বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে সংশ্লিষ্ট দেশকে ধীরে ধীরে মার্কিন নজরদারি প্রযুক্তি, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কিনতে উৎসাহিত বা চাপ দেওয়া হয়।

বিশ্লেষণে বলা হয়, এই চাপ অনেক সময় কূটনৈতিক ভাষায় উপস্থাপন করা হলেও মূল বার্তা থাকে স্পষ্ট—রাশিয়া ও চীনের সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ক্রয় ব্যবস্থাকে এমন একটি একক মার্কিনভিত্তিক কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়া হতে পারে, যেখানে মার্কিন সামরিক প্ল্যাটফর্ম, গোলাবারুদ, সফটওয়্যার, এনক্রিপশন ব্যবস্থা এবং খুচরা যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হবে। আর এসবই যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি অনুমোদনের আওতাধীন থাকবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকাশ্যে এসব চুক্তিকে ‘সামুদ্রিক নিরাপত্তা’ ও ‘হুমকি মোকাবিলা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এর ভেতরে ঔপনিবেশিক অর্থনীতির পুরোনো ধারা কাজ করে। যেখানে একটি নির্ভরশীল রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করে বিদেশি অস্ত্র কোম্পানিগুলোর মুনাফা নিশ্চিত করা হয়। নিরাপত্তা সহযোগিতার কথা যত বেশি বলা হয়, তত বেশি অর্থ ঢাকা থেকে বিদেশি করপোরেট সদরদপ্তরে চলে যায় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া বোয়িং থেকে বড় পরিসরে উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের প্রকৃত বিমান পরিবহন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে বড় ধরনের বিমান ক্রয় করা হলে তা বাংলাদেশের জন্য ঋণঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব উড়োজাহাজ চুক্তিকে ‘আধুনিক বিমান ব্যবস্থা’ এবং ‘উন্নত বহর গঠন’-এর বিনিয়োগ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এগুলোর মূল্য ডলারে পরিশোধ করতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বা লিজের মাধ্যমে এই অর্থায়ন করা হয় এবং এর সঙ্গে মার্কিন যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও যুক্ত থাকে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের বিমান ইঞ্জিন আমদানি ইতোমধ্যে ১৩৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৫২ কোটিতে পৌঁছেছে। বিশ্লেষণে বলা হয়, যাত্রী পরিবহনের পূর্বাভাস ভুল প্রমাণিত হলে অথবা জাতীয় বিমান সংস্থায় অদক্ষতা ও দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

ঋণের বোঝায় চাপা অর্থনীতির জন্য এই ধরনের চুক্তিগুলো শেষ পর্যন্ত ‘ঋণের ফাঁদে’ পরিণত হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

সূত্র: INDIA New England News

এই শাখার আরও খবর

বিজেপির ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ঠেকানো রাজনীতি বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলছে

মেলবোর্ন, ১৯ মে- ভারতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ইস্যু বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে…

যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদে বন্দুক হামলা, হামলাকারীসহ নিহত ৫

মেলবোর্ন, ১৯ মে- যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি ইসলামিক সেন্টারের মসজিদে ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্যান ডিয়েগো শহরে সংঘটিত এই হামলায় মসজিদের একজন নিরাপত্তাকর্মীসহ…

পর্নোগ্রাফি মামলায় মাওলানা মিরাজ আহমেদ গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ১৯ মে- নাটোরের সিংড়া উপজেলায় এক প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে তুলে গোপনে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ এবং পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার…

ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করলেন ট্রাম্প, চলছে সমঝোতার চেষ্টা

মেলবোর্ন, ১০ মে- ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলার পরিকল্পনা থেকে আপাতত সরে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মঙ্গলবার তিনি ইরানে…

নেইমারকে নিয়েই ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দল ঘোষণা

মেলবোর্ন, ১৯ মে- বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বহুল প্রতীক্ষিত ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। তবে দল ঘোষণার আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল…

এ বছর বাংলাদেশ থেকে ৬ হাজার চালক নিবে দুবাই

মেলবোর্ন, ১৯ মে- সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানি চলতি বছরে বাংলাদেশ থেকে ৬ হাজার চালক নিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ধাপে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au