অস্ট্রেলিয়ায় নিজ বাড়িতে তিনজনকে হত্যার পর পুলিশকে ফোন, বাংলাদেশি নাগরিক আটক
মেলবোর্ন, ১৯ মে- অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ক্যাম্পবেলটাউন এলাকায় এক বাংলাদেশি পরিবারের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। নিজ বাড়িতে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার অভিযোগে ৪৭ বছর বয়সি…
মেলবোর্ন, ১৯ মে- ভারতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ইস্যু বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছে। দলটির নেতারা বিভিন্ন সময় “অনুপ্রবেশকারী”, “ঘুসপেটিয়া” এমনকি “উইপোকা” শব্দ ব্যবহার করে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে তীব্র বক্তব্য দিয়েছেন। তবে সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বাস্তবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের সময়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো বা বহিষ্কৃত মানুষের সংখ্যা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের সময়ের তুলনায় অনেক কম।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের ১০ বছরে মোট ৩ হাজার ৫৬৮ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অথচ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের সময়, অর্থাৎ ২০০৫ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল ৮২ হাজার ২৫৫ জনকে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বিজেপি সরকারের রাজনৈতিক বক্তব্যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা যতটা জোর দিয়ে বলা হয়েছে, বাস্তবে সেই তুলনায় বহিষ্কারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৩ গুণ কম।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে বিজেপি এই ইস্যুকে ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সময়ও “অনুপ্রবেশ” ছিল বিজেপির অন্যতম প্রধান নির্বাচনী ইস্যু।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজেপি কেন্দ্রীয়ভাবে “ডিটেকশন, ডিলিশন অ্যান্ড ডিপোর্টেশন” বা শনাক্তকরণ, ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং বহিষ্কার—এই তিন নীতির ভিত্তিতে অভিবাসনবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে।

সিলেটের বিভিন্ন সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী | ছবি: সংগৃহীত
২০১৪ সালের ২৩ জুলাই তথ্য অধিকার আইনের এক আবেদনের জবাবে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো এবং অবৈধভাবে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের শনাক্ত ও বহিষ্কার করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
তবে সরকারি পরিসংখ্যান ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতি বছর যথাক্রমে ৯৮৯, ৪৭৪, ৩০৮, ৫১, ৪৪৫, ২৯৯, ২৪৬, ৫০, ৪১১ এবং ২৯৫ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে ইউপিএ সরকারের সময় ২০০৫ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্রতি বছর ফেরত পাঠানো মানুষের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৪ হাজার ৯১৬, ১৩ হাজার ৬৯২, ১২ হাজার ১৩৫, ১২ হাজার ৬২৫, ১০ হাজার ৬০২, ৬ হাজার ২৯০, ৬ হাজার ৭৬১ এবং ৫ হাজার ২৩৪।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ ইস্যু বিজেপির জন্য বাস্তব প্রশাসনিক পদক্ষেপের চেয়ে রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বার্ষিক প্রতিবেদনে “অনুপ্রবেশ” শব্দটি বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে শব্দটি ৩৪ বার এসেছে। আর ২০০৫-০৬ সালের প্রতিবেদনে এসেছে ২৭ বার।
২০০৫-০৬ সালের প্রতিবেদনে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে “ঝুঁকিপূর্ণ” এবং “ছিদ্রযুক্ত” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, সীমান্তপথে অবৈধ কার্যক্রম ঠেকানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য দুই ধাপে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়।
২০২৪ সালে ভারত সরকার সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে আলাদা “ডিপার্টমেন্ট অব বর্ডার ম্যানেজমেন্ট” গঠন করে। সীমান্তে উন্নত প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক নজরদারি, বৈদ্যুতিক বেড়া, ফ্লাডলাইট ও টহল বৃদ্ধির কথাও সরকারি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
তবে এতসব ব্যবস্থার পরও ২০২৪ সালে মাত্র ২৯৫ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যা রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার বড় পার্থক্য তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব নেওয়ার পর সীমান্ত নিরাপত্তাকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকায় বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের মাধ্যমে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন করা হবে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করা হবে।
২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত দিল্লি পুলিশ ও ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ৩ হাজার ৭০০-র বেশি বাংলাদেশিকে বহিষ্কারের কথা বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
তবে এসব অভিযানে ভুলবশত ভারতীয় নাগরিকদেরও বাংলাদেশি হিসেবে আটক বা বহিষ্কারের অভিযোগ উঠেছে।
আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারণায় “অনুপ্রবেশ” ইস্যুটি বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিভিন্ন সভায় পশ্চিমবঙ্গকে “অনুপ্রবেশমুক্ত” করার প্রতিশ্রুতি দেন।
বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রচারণায় “ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট” নীতিকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। তবে এসব বক্তব্য শত শত ভাষণ, সাক্ষাৎকার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে থাকায় সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে ভারতীয় রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশেও তীব্র ছিল। বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে সমালোচনা প্রকাশিত হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রতিবাদ জানান।
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলেও সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া ও উত্তর ২৪ পরগনায় বিজেপির আসন সংখ্যা ২০২১ সালের ৩৫ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৯১-এ পৌঁছায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়। দলটি ৬৮টি আসন জেতে এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট মোট ৭৭টি আসন পায়।
এর মধ্যে ৬৮টির মধ্যে ৫১টি আসন ছিল ভারত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলেও জামায়াত নতুন করে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের নির্বাচনী মানচিত্র পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সীমান্তের দুই পাশেই ধর্মভিত্তিক ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান ভবিষ্যতে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে উসকানিমূলক বক্তব্য বা প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au