নেইমারকে নিয়েই ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দল ঘোষণা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৯ মে- বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বহুল প্রতীক্ষিত ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। তবে দল ঘোষণার আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল একটাই—নেইমার থাকছেন কি থাকছেন না। দীর্ঘদিনের চোট, অস্ত্রোপচার, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া, ফিটনেস নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নানা গুঞ্জনের পর অবশেষে সেই জল্পনার অবসান ঘটেছে।
ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞ তারকা নেইমার জুনিয়রকেই বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা দিয়েছেন। রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত ‘মিউজিয়াম অব টুমরো’তে আয়োজিত জমকালো সংবাদ সম্মেলনে যখন আনচেলত্তি একে একে খেলোয়াড়দের নাম ঘোষণা করছিলেন, তখন সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা ছিল নেইমারের নাম শোনার জন্য। অবশেষে ইতালিয়ান এই কোচের কণ্ঠে নেইমারের নাম উচ্চারিত হতেই পুরো মিলনায়তন করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে ঘিরে ব্রাজিলজুড়ে তৈরি হয় উচ্ছ্বাসের আবহ। কারণ গত প্রায় দুই বছর জাতীয় দলের বাইরে থাকা নেইমারের বিশ্বকাপ দলে ফেরা অনেকের কাছেই ছিল অনিশ্চিত। ২০২৩ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে গুরুতর হাঁটুর চোটে পড়ার পর দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। অস্ত্রোপচারের পর পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও সহজ ছিল না। সেই সঙ্গে সৌদি আরবে তার সময়টাও ছিল চোট ও অনিয়মিত পারফরম্যান্সে ভরা।
এমন পরিস্থিতিতে ব্রাজিল দলে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। বিশেষ করে গত মার্চে ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের স্কোয়াডেও তাকে রাখা হয়নি। তখন থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, হয়তো নতুন প্রজন্মের দল গড়ার পরিকল্পনায় নেইমারকে বাদ দিয়েই এগোতে পারেন আনচেলত্তি।
তবে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার ওপরই আস্থা রাখলেন ইতালিয়ান এই কোচ। সৌদি আরবের অধ্যায় শেষ করে চলতি বছরের জানুয়ারিতে শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফেরার পর নেইমার ধীরে ধীরে নিজের পুরোনো ছন্দ ফিরে পান। ব্রাজিলিয়ান লিগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তার পারফরম্যান্স কোচিং স্টাফের আস্থা ফিরিয়ে আনে।
বিশেষ করে ফিটনেস ফিরে পাওয়ার পর সান্তোসের হয়ে তার নেতৃত্ব, আক্রমণভাগে প্রভাব এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আবারও প্রমাণ করে যে বড় মঞ্চে এখনো তিনি পার্থক্য গড়ে দিতে সক্ষম।
এর ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের পর এবার ক্যারিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। জাতীয় দলের জার্সিতে এখন পর্যন্ত ১২৮ ম্যাচে ৭৯ গোল করেছেন তিনি।
বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়া নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আনচেলত্তি বলেন, “নেইমার শুধু একজন ফুটবলার নয়, সে একটি অভিজ্ঞতা। বড় টুর্নামেন্টে তার উপস্থিতি দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সে এখন অনেক বেশি পরিণত এবং নিজের দায়িত্ব বোঝে।”
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের নেতৃত্বে থাকবেন অভিজ্ঞ ও তরুণ তারকাদের সমন্বয়ে গড়া একটি শক্তিশালী দল। আক্রমণভাগে নেইমারের সঙ্গে থাকছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি, মাথেউস কুনিয়া ও তরুণ প্রতিভা এনদ্রিক।
রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে এবারের দলের অন্যতম বড় ভরসা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত কয়েক মৌসুমে ইউরোপীয় ফুটবলে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজেকে বিশ্বের সেরা উইঙ্গারদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।
বার্সেলোনার রাফিনিয়াও দারুণ ফর্মে রয়েছেন। অন্যদিকে আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি গতিময় ফুটবল ও গোল করার দক্ষতায় ইতোমধ্যে জাতীয় দলে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তৈরি করেছেন।
মিডফিল্ডে অভিজ্ঞ কাসেমিরোর পাশাপাশি রয়েছেন ব্রুনো গিমারেস, ফাবিনিও ও লুকাস পাকেতার মতো খেলোয়াড়। মাঝমাঠে ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্বে থাকবেন এই তারকারা।
রক্ষণভাগেও অভিজ্ঞতা ও শক্তির মিশেল রেখেছেন আনচেলত্তি। পিএসজির অধিনায়ক মার্কিনিওস, জুভেন্টাসের ব্রেমার, আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল ও দানিলোর মতো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারদের নিয়ে গড়া হয়েছে ব্যাকলাইন।
গোলবারের দায়িত্বে থাকছেন লিভারপুলের আলিসন ও এদেরসনের মতো বিশ্বমানের গোলরক্ষকরা।
আগামী ১৩ জুন মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের অভিযান শুরু করবে ব্রাজিল। গ্রুপ ‘সি’-তে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ হাইতি ও স্কটল্যান্ড।
বিশ্বকাপে ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে সেলেসাওরা। দীর্ঘদিন ধরেই ‘হেক্সা’ জয়ের স্বপ্ন দেখছে ব্রাজিল সমর্থকরা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালের বাধা পেরোতে না পারায় সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে দলটিকে।
এবার সেই হতাশা কাটিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ার প্রত্যয় নিয়ে বিশ্বকাপ মিশনে যাচ্ছে ব্রাজিল। আর সেই অভিযানের সবচেয়ে বড় আলোচনার নাম নিঃসন্দেহে নেইমার জুনিয়র।
ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড:
গোলরক্ষক: আলিসন, এদেরসন, ওয়েভারতন।
ডিফেন্ডার: অ্যালেক্স সান্দ্রো, ব্রেমার, দানিলো, দগলাস সান্তোস, গ্যাব্রিয়েল, রজার ইবানেজ, লিও পেরেইরা, মার্কিনিওস, ওয়েসলি।
মিডফিল্ডার: ব্রুনো গিমারেস, কাসেমিরো, দানিলো, ফাবিনিও, লুকাস পাকেতা।
ফরোয়ার্ড: এনদ্রিক, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি, ইগর থিয়াগো, লুইস এনরিকে, মাথেউস কুনিয়া, নেইমার, রাফিনিয়া, রায়ান, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।