ইরানে হামলা স্থগিত ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১০ মে- ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলার পরিকল্পনা থেকে আপাতত সরে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মঙ্গলবার তিনি ইরানে বড় আকারের হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য একটি চুক্তির অগ্রগতি এবং উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলোর অনুরোধের কারণে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে তাকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল যাতে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলা শুরু না করা হয়। কারণ, যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে পাল্টা হামলা চালাতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। তবে এই যুদ্ধবিরতি যে এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, ট্রাম্পের বক্তব্যে সেটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে তিনি আগ্রহী। তবে তার দেওয়া যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব ও সমঝোতার রূপরেখা ইরান প্রত্যাখ্যান করায় পরিস্থিতি আবারও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই মঙ্গলবার নতুন হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
ট্রাম্পের ভাষায়, “গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। আমরা এখনো একটি সমঝোতার সম্ভাবনা দেখছি। তবে যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত আছে।”
তিনি আরও জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ প্রস্তুত অবস্থায় থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে খুব অল্প সময়ের নোটিশেই ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে ইরান পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য সামরিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের পরদিনই ট্রাম্প তেহরানকে উদ্দেশ করে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, “ইরানের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তারা যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে তাদের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।”
ট্রাম্পের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ওয়াশিংটন কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছে, অন্যদিকে একই সঙ্গে সামরিক চাপও বাড়িয়ে যাচ্ছে।
এদিকে এখন পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে পিছু হটতে প্রস্তুত। তেহরান বরং যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ হলে কঠোর জবাব দেওয়ার অবস্থানেই রয়েছে বলে আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি মঙ্গলবার তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, চলমান উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যোগাযোগ ও আলোচনায় পাকিস্তান অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। ইসলামাবাদ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোও যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কায় গভীর উদ্বেগে রয়েছে। বিশেষ করে ইরান যদি উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি স্থাপনা বা বাণিজ্যিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ফলে একদিকে সামরিক প্রস্তুতি অব্যাহত থাকলেও, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।
তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং ইসরায়েলকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে এই আলোচনা কতটা সফল হবে, তা এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
সূত্রঃ এএফপি