বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ল তেলের দাম
মেলবোর্ন, ২৭ মে- ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। একদিনের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে, যা নিয়ে নতুন…
মেলবোর্ন, ২৫ মে-
১৬ জুলাই, ২০২৫। সেদিন গোপালগঞ্জের আকাশ থমথমে ছিল। সকাল থেকেই শহরের অলিগলিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় নাগরিক পার্টির কর্মসূচিকে ঘিরে যে সংঘাতের শঙ্কা ছিল, দুপুর গড়াতে না গড়াতেই তা রক্তক্ষয়ী রূপ নেয়। স্লোগান-পাল্টা স্লোগান, ইট-পাটকেল, আগুন—সব মিলে শান্ত শহর মুহূর্তে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বিকেলে সেনাবাহিনী নামে, রাতে জারি হয় কারফিউ। পুরো ঘটনা লাইভে দেখে স্তব্ধ হয়ে যায় দেশবাসী।
শুরুটা হয়েছিল কথার আঘাত দিয়ে। এনসিপি নেতাদের মুখে শোনা যায় “আওয়ামী লীগ মুর্দাবাদ, শেখ মুজিব মুর্দাবাদ, শেখ হাসিনা মুর্দাবাদ, গোপালগঞ্জ মুর্দাবাদ”। রাজনীতিতে সমালোচনা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন তা অবমাননার সীমা ছাড়ায়, তখন সেটা আর মতপ্রকাশ থাকে না, হয়ে দাঁড়ায় উসকানি।
গোপালগঞ্জের জন্য এই শব্দগুলো শুধু রাজনৈতিক নয়, এটা আবেগের প্রশ্ন। এ মাটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমি। এখানে “গোপালগঞ্জ মুর্দাবাদ” বলা মানে স্থানীয় মানুষের ইতিহাস, পরিচয় আর আত্মমর্যাদায় আঘাত করা। তাই মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। এটা প্রতিশোধ নয়, এটা নিজেদের সম্মান রক্ষার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।
কিন্তু প্রতিক্রিয়া যখন সহিংসতায় গড়ায়, তখন প্রশ্ন জাগে—এটা কি প্রতিরোধ, নাকি প্রতিশোধের রাজনীতি? সংলাপের পথ বন্ধ হয়ে যায়, রাস্তাই হয়ে ওঠে একমাত্র মঞ্চ।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য দেখা যায় সেনাবাহিনী মাঠে নামার পর। লাইভ ফুটেজে দেখা যায় গুলি চলছে। সেদিন ৫ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান, আহত হন তিন শতাধিক।
প্রশ্ন হলো, কেন নিরস্ত্র মানুষের ওপর একাত্তরের পাকিস্তানি বাহিনীর মতো গুলি চালাতে হবে? ৫৪ বছর পর নিজের দেশের মাটিতে, নিজের সেনাবাহিনীর গুলিতে সাধারণ মানুষের মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেনাবাহিনীর কাজ রক্ষা করা, দমন করা নয়। ভিড় সরাতে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান, আলোচনা—এসব পথ থাকতেও কেন তা ব্যবহার হলো না, তার জবাব এখনো মেলেনি।
ঘটনার পরের চিত্র আরও হতাশাজনক। গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়, চলে গ্রেপ্তার। যারা রাস্তায় নেমেছিল তারাই আজ কারাগারে। অথচ যারা গুলি চালাল, তাদের দায় নিয়ে রয়েছে নীরবতা। আহত তিন শতাধিক, অথচ আসামি হলো ভুক্তভোগীরাই—এটাকে কি বিচার বলা যায়?
হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হয়েছে। তারা আজও জেল খাটছে। এই দৃশ্য দেখলে মনে পড়ে যায় ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম দিনলিপি।
আরও কষ্টের বিষয় হলো, বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো সব দেখেও চুপ করে রইল। লাইভে দেখল, কিন্তু একটি কথাও বলল না। ক্ষমতাবানরা যখন নীরব থাকে, তখন অন্যায়ই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। বিবেক কেন নীরব—এই প্রশ্নের জবাব আজও অজানা।
এই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এনসিপি দল গড়ে উঠেছে অবৈধ অসাংবিধানিক ইউনুসের সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়। সেনাবাহিনী প্রোটোকল দিয়েছে। তাই প্রশ্ন ওঠে, এটা কি সত্যিকারের রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল, নাকি পরিকল্পিত সংঘাতের মঞ্চ? মাঠে স্বাধীনতাবিরোধী কিছু ছাত্রের উপস্থিতির কথাও শোনা যায়। যদি রাজনীতি হয় সংলাপ, তবে এটা রাজনীতি নয়—এটা উসকানি আর প্রতিশোধের খেলা।
গোপালগঞ্জ শুধু একটি জেলা নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে যা ঘটে, তার প্রভাব পড়ে সারা দেশে। গোপালগঞ্জের ঘটনা এটা বিপজ্জনক নজির হিসেবে থাকবে।
১৬ জুলাই গোপালগঞ্জ গণহত্যা দিবস হওয়া উচিত।
যেদিন ৫টি প্রাণ ঝরে গেল, তিন শতাধিক মানুষ আহত হলো, সেই দিনকে ভুলে গেলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। দিবস মানে উৎসব নয়, দিবস মানে স্মরণ। স্মরণ মানে যেন আর কখনো এমন রক্ত না ঝরে। যেন গুলি চালানোর আগে রাষ্ট্র ভাবে, স্লোগান দেওয়ার আগে রাজনীতি ভাবে।
গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধুর মাটি। এখানে রাজনীতি হবে, প্রতিযোগিতা হবে, বিতর্ক হবে। কিন্তু তা হতে হবে ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করে, মানুষকে সম্মান করে।
৫টি প্রাণ আর ফিরবে না। আহতদের ক্ষতও সহজে শুকাবে না। কিন্তু ন্যায়বিচার না হলে ক্ষতটা আরও গভীর হবে। দায় শুধু মাঠের মানুষের নয়, দায় তাদেরও যারা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে, প্রোটোকল দিয়েছে আর নীরব থেকেছে।
গোপালগঞ্জে গণহত্যার দায় কার? বিবেক নীরব কেন? এই দুটি প্রশ্নের উত্তর না মেলা পর্যন্ত জাতি স্বস্তি পাবে না।
আমরা যেন গোপালগঞ্জের গণহত্যার কথা ভুলে না যাই।
লেখক- সরদার সেলিম রেজা, কবি; প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au