বাংলাদেশ

প্রতিবেশের সেতুবন্ধন: ভাষার মিলনে নতুন দিগন্ত

মতামত- সরদার সেলিম রেজা

  • 9:41 pm - July 11, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৬৭ বার
প্রতিবেশের সেতুবন্ধন। এআই ছবি

মেলবোর্ন, ১১ জুলাই- বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শুধু কাগজের চুক্তি না, এটা ৪ হাজার কিমি সীমান্তের গল্প। পৃথিবীর পঞ্চম দীর্ঘতম স্থলসীমান্ত এটি। ২০১৫ সালে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময়ের পর ৫০ হাজার মানুষ প্রথমবারের মতো পূর্ণ নাগরিকত্ব পেয়েছে। এই সীমান্তে ৫৪টি অভিন্ন নদী বয়ে গেছে, যার অববাহিকায় বাস করে ৬ কোটি মানুষ। পানি, বাণিজ্য, মানুষের যাতায়াত—সব মিলিয়ে দুই দেশ একে অপরের “ভূগোলের ভাগ্য”।

কূটনীতিতে রাষ্ট্রদূতের টেবিলে শুধু রাজনীতি থাকে না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্য ১৫.৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বেনাপোল-পেট্রাপোল দিয়ে দৈনিক গড়ে ৩ হাজার ট্রাক পণ্য আসা-যাওয়া করে। বাংলাদেশ ভারতে তৈরি পোশাক, পাটপণ্য, ওষুধ রপ্তানি করে। ২০২৪ সালে ভারত ১.৭ মিলিয়ন ভিসা দিয়েছে বাংলাদেশিকে—দৈনিক ৪৬০টি। এর ৭০% মেডিকেল ভিসা। কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লির হাসপাতালে বছরে ২ লাখের বেশি বাংলাদেশি রোগী চিকিৎসা নেন। তাই রাষ্ট্রদূত মানেই বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, পানি, নিরাপত্তা—সব এজেন্ডার সমন্বয়ক।

দীনেশ ত্রিবেদী: পরিচয় ও ব্যতিক্রম

ভারতের মনোনীত হাইকমিশনার শ্রী দীনেশ ত্রিবেদী আলোচনায় তিনটি কারণে।

১. রাজনৈতিক-প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা: ২০০৯-২০১২ সালে তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ছিলেন। ১৩ লাখ কর্মীর প্রতিষ্ঠান, দৈনিক ২.৩ কোটি যাত্রী—এত বড় দপ্তর সামলানোর অভিজ্ঞতা কূটনীতিতে সরাসরি কাজে লাগবে। মৈত্রী, বন্ধন, মিতালী এক্সপ্রেসের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, কার্গো ট্রেনের গতি বাড়ানো—এসব ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিজ্ঞতা দরকার।

২. সংসদীয় দক্ষতা: ২০০৯, ২০১৪, ২০১৯ এ লোকসভা সদস্য। পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতের প্রতিনিধি। পরিবহন, অর্থ, স্বাস্থ্য কমিটিতে কাজ করেছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ও সংসদে যারা নীতি ঠিক করেন, তাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের সক্ষমতা তার আছে। এটা দ্বিপাক্ষিক সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে সাহায্য করবে।

৩. ভাষা-সংস্কৃতির সেতু: তিনি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, বাংলা ভাষায় সাবলীল। বেনাপোল-পেট্রাপোল দিয়ে পায়ে হেঁটে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। তার আঞ্চলিক টান, শব্দচয়ন এ দেশের মানুষের মতো। ফলে তিনি বিদেশি কূটনীতিকের চেয়ে প্রতিবেশী অঞ্চলের মানুষ বলেই মনে হন। ভাষার মিল কূটনীতির আনুষ্ঠানিকতার বাইরে মানুষে-মানুষে আস্থা তৈরি করে।

৪. নিয়োগের তাৎপর্য: ১৯৭২-২০২৪ এ বাংলাদেশে নিযুক্ত ১৯ জন ভারতীয় হাইকমিশনারের ১৭ জনই পেশাদার কূটনীতিক ছিলেন। সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে হাইকমিশনার করা গত পাঁচ দশকে বিরল। এটা বোঝায়—বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে দিল্লি এখন রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

সংখ্যায় সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

২০২৩-২৪ এ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৫.৯ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের রপ্তানি ১.৫ বিলিয়ন, আমদানি ১৪.৪ বিলিয়ন। ৮ বিলিয়ন ডলার লাইন অব ক্রেডিটে পদ্মা সেতু রেল, খুলনা-কলকাতা রেল, আখাউড়া-আগরতলা রেল প্রকল্প এগোচ্ছে।

৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে গঙ্গা চুক্তি ১৯৬ সাল থেকে চলছে, তিস্তা চুক্তি আলোচনায় আছে। আইপিসির রিপোর্ট বলছে ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীর পানির প্রবাহ ১৫-২০% কমতে পারে। লবণাক্ততা, বন্যা, খরা—এসব মোকাবিলায় যৌথ গবেষণা, তথ্য বিনিময় ও ন্যায্য বণ্টন দরকার। একজন বাংলা ভাষাভাষী রাষ্ট্রদূত এই সংলাপকে আরও সহজ করতে পারেন।

একই ভাষায় থাকার সুবিধা: রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক দিগন্ত

১৯৭১ সালে “স্বাধীন বাংলা বেতার” প্রমাণ করেছিল একই ভাষা একটি জাতিকে বাঁচাতে পারে। আজ সেই ভাষাই দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় “নরম শক্তি” হতে পারে।

১. রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা: একই ভাষা হওয়ায় দোভাষী ছাড়াই সরাসরি কথা বলা যায়। তিস্তা, গঙ্গার পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, ছিটমহল পরবর্তী ইস্যু—এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে আস্থার সাথে আলোচনা সম্ভব। দীনেশ ত্রিবেদীর মতো বাংলা-ভাষী রাষ্ট্রদূত থাকলে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া যাবে। দুই দেশ SAARC, BIMSTEC এ “বাংলা ব্লক” হয়ে কথা বললে আঞ্চলিক নেতৃত্বের শক্তি বাড়বে।

২. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুবিধা: ভাষার কারণে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ঢাকাকে “বিদেশ” না, “আত্মীয়ের বাড়ি” মনে করে। এতে চিকিৎসা, শিক্ষা, পর্যটন সহজ হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করতে পারে। যৌথ সিনেমা, নাটক, বইমেলা, ইউটিউব কনটেন্টের মাধ্যমে ৩০ কোটি বাঙালির “সাংস্কৃতিক বাজার” তৈরি হবে। তরুণ প্রজন্ম একসাথে কাজ করলে “বাঙালি ব্র্যান্ড” বিশ্বে শক্তিশালী হবে।

৩. অর্থনৈতিক সুবিধা: একই ভাষায় ব্যবসায়িক চুক্তি, বিজ্ঞাপন, মার্কেটিং সহজ। বেনাপোল-পেট্রাপোলের ব্যবসায়ীরা সরাসরি দর-কষাকষি করতে পারবে। বর্তমান ১৫.৯ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সহজেই ৫০ বিলিয়নে যাওয়া সম্ভব। যৌথ আইটি, স্টার্টআপ, ফ্যাশন ও খাদ্য শিল্প গড়ে উঠবে। “মুক্তিযুদ্ধ সার্কিট” ও “রবীন্দ্র-নজরুল সার্কিট” মিলিয়ে পর্যটন শিল্পে বিপ্লব আসবে।

৪. পরিবেশ ও মানবিক সুবিধা: ঘূর্ণিঝড়, বন্যার আগাম সতর্কবার্তা দুই দেশের রেডিও-টিভি একই ভাষায় দিতে পারবে। ৫৪টি নদীর পানি, লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যৌথ গবেষণা সহজ হবে। কলকাতা-চেন্নাই-দিল্লির সাথে বাংলাদেশের হাসপাতালের টেলিমেডিসিন নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হবে।

৫. নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি: সীমান্তে চোরাচালান ও জঙ্গিবাদ নিয়ে দুই দেশের পুলিশ একই ভাষায় গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করতে পারবে।

ইতিবাচক প্রত্যাশায়

দিনশেষে সম্পর্ক টিকে থাকে বিশ্বাস, সম্মান আর পারস্পরিক সহযোগিতায়। দীনেশ ত্রিবেদীর মতো অভিজ্ঞ নেতার উপস্থিতি সেই বার্তাই দেয়—প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বোঝাপড়া আরও গভীর হতে পারে। আমরা আশা করি, আগামীর দিনগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। বাণিজ্য বাড়বে, মানুষের যাতায়াত আরও সহজ হবে, শিক্ষা-সংস্কৃতির আদান-প্রদান প্রাণবন্ত হবে।

রাষ্ট্রদূত আসে-যায়, সরকার বদলায়—কিন্তু প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্কই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে। দীনেশ ত্রিবেদীর ভাষাগত নৈকট্য ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা যদি কূটনৈতিক দক্ষতার সাথে মেলে, তাহলে দুই দেশের মানুষের মধ্যে আস্থা ও বন্ধুত্বের নতুন দিগন্ত খুলবে। আমরা হাঁটতে চাই সহযোগিতা, সম্মান আর ভাগাভাগি করা সমৃদ্ধির পথে। কারণ রাষ্ট্রদূত আসেন যান, কিন্তু নদী বয়ে চলে, মানুষ থেকে যায়, সম্পর্ক থাকে। সেতু মজবুত হলে কোনো দুর্যোগই সেই সম্পর্ক ভাঙতে পারবে না।

লেখক-

সরদার সেলিম রেজা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কবি ও পরিবেশ কর্মী  সভাপতি, বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র।

এই শাখার আরও খবর

তিন কাউন্সিলর নিয়েই ইংরেজবাজার পুরসভা বিজেপির দখলে

মালদহ জেলা পরিষদের পর এবার ইংরেজবাজার পুরসভাও দখলে নিল বিজেপি। বুধবার চেয়ারম্যান নির্বাচনের ভোটাভুটিতে বিজেপি প্রার্থী অম্লান ভাদুড়িকে সমর্থন করেন তৃণমূল থেকে ‘নির্দল’ হওয়া ১১…

শর্তসাপেক্ষে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিত সরকারের

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশের সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তবে এ ধরনের প্রক্রিয়া শুরুর আগে…

রামেবির ভিসিকে ‘মব’ সৃষ্টি করে পদত্যাগ: বিএনপি নেতা গ্রেপ্তার

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হককে একদল মানুষ জোরপূর্বক ঘেরাও করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আব্দুস সালাম (৫৬)…

গণপতি পরিবার হত্যাকাণ্ড: দেড় মাসেও কাটেনি ভয়, এলাকায় নেই পূজার আমেজ

রংপুর নগরীর হিন্দু অধ্যুষিত মাছুয়াপাড়া মহল্লায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে হত্যার ঘটনায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও আতঙ্ক কাটেনি স্থানীয়…

সেনাবাহিনীতে বড় রদবদল, সংকুচিত হচ্ছে ওয়াকার-উজ-জামানের প্রভাব?

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গত ৮ সেপ্টেম্বর জারি করা একাধিক সীমিত-প্রচলন বা ‘রেস্ট্রিক্টেড’ বদলি ও পদায়নের আদেশ ঘিরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন…

চিত্রনায়ক শান্ত খানকে পিটিয়ে হত্যা, কী দোষ ছিল তার?

দুই বছর পর কবর থেকে উঠেছে চিত্রনায়ক শান্ত খান ও তার বাবা সেলিম খানের মরদেহ। আদালতের নির্দেশে বুধবার (৭ অক্টোবর) চাঁদপুরের লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের পারিবারিক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au