বেলফাস্টে ছুরিকাঘাত ও শিরশ্ছেদের চেষ্টা, উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড়। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১০ জুন- উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্টে এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত ও শিরশ্ছেদের চেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে সহিংস উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ এবং সামাজিক অস্থিরতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সহিংস উগ্রবাদের বিস্তার এখন সরকারগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোমবার রাতে বেলফাস্টে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ এ ঘটনায় এক সুদানি আশ্রয়প্রার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একটি রান্নাঘরের ছুরি দিয়ে এক ব্যক্তির ওপর হামলা চালান এবং তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গলায় আঘাত করে শিরশ্ছেদের চেষ্টা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় ভুক্তভোগী ব্যক্তি মাটিতে পড়ে ছিলেন। এ সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি তার গলার দিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে থাকেন। ঘটনাটি দেখে আশপাশের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত এগিয়ে এসে আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। হামলাকারীর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।
এ ঘটনার পর উত্তর আয়ারল্যান্ডজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হামলাকারী একজন সুদানি নাগরিক এবং আশ্রয়প্রার্থী বলে পরিচয় প্রকাশ হওয়ার পর বেলফাস্টসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও দাঙ্গার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
দাঙ্গার সময় বিভিন্ন স্থানে বাড়িঘর ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একাধিক এলাকায় জরুরি সেবা বিভাগের সদস্যদের মোতায়েন করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিক জেরোমি চিকোনে এ প্রসঙ্গে বলেন, সহিংস উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এখন শুধু কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন সরকার এ ধরনের চরমপন্থা প্রতিরোধে কাজ করছে।
তিনি জানান, অস্ট্রেলিয়া সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে উগ্রবাদ প্রতিরোধ, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম এবং সহিংস চরমপন্থা মোকাবিলার জন্য ১০ কোটি ৬০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার বরাদ্দ রেখেছে।
তার মতে, এই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হবে এমন কর্মসূচিতে, যেগুলোর মাধ্যমে তরুণদের উগ্রবাদী মতাদর্শের প্রভাব থেকে দূরে রাখা এবং চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়া রোধ করা সম্ভব হবে।
চিকোনে বলেন, বর্তমানে অনেক তরুণ বিভিন্ন উগ্রবাদী আদর্শের প্রভাবে আক্রান্ত হচ্ছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়। তাই শিক্ষা ও সচেতনতার মাধ্যমে তাদের সুরক্ষিত রাখা এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
তবে বেলফাস্টের ঘটনার পর শুরু হওয়া সহিংস প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি। তার মতে, মানুষ ঘটনার কারণে ক্ষুব্ধ হতে পারে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো সমাধান নয়।
তিনি বলেন, জনগণের উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া। তদন্তের মাধ্যমে হামলার প্রকৃত কারণ ও উদ্দেশ্য উদঘাটন করা প্রয়োজন।
চিকোনে আরও বলেন, কোনো ব্যক্তির গায়ের রং, জাতিগত পরিচয় বা আশ্রয়প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি দেখে পুরো একটি সম্প্রদায় সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। একটি অপরাধের দায় কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি কোনো ঘটনার পর প্রতিশোধমূলক মনোভাব থেকে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তাহলে সহিংসতা আরও বাড়বে এবং একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটার ঝুঁকি তৈরি হবে।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ও সিডনিতে ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত কিছু ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতি সমাজে নতুন সংকট সৃষ্টি করে।
তিনি জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক শান্তি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তেজনা নয়, বরং সংযম ও ঐক্যের প্রয়োজন। একই আহ্বান অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং দেশটির নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানও বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বেলফাস্টের সাম্প্রতিক ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে সহিংস উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ, অভিবাসন প্রশ্ন এবং সামাজিক বিভাজন এখন বহু দেশের জন্য পরস্পর-সম্পর্কিত একটি জটিল চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ফলে শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করাই নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতি, শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।