গাইবান্ধার পলাশবাড়ী । ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১২ জুন- গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে আলোচিত ‘এশিয়ার সর্ববৃহৎ রামমূর্তি’ নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে সৃষ্টি হওয়া বিতর্ক, জনমত ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্নে আপাতত নির্মাণকাজ স্থগিত ঘোষণা করেছে সংশ্লিষ্ট মন্দির কর্তৃপক্ষ। বৃহৎ এই প্রকল্পের অর্থায়নের উৎস, ব্যয়ের পরিমাণ এবং এর সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির কমিটির নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজ স্থগিতের ঘোষণা দেন। তারা জানান, প্রকল্পটি নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে নানা ধরনের মতামত, প্রশ্ন ও আপত্তি উঠে এসেছে। পাশাপাশি ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থেও আপাতত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্দির কমিটির নেতারা বলেন, এ সিদ্ধান্ত কোনো রাজনৈতিক দল, প্রশাসন কিংবা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর চাপে নেওয়া হয়নি। বরং এলাকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং সকল ধর্মের মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষার লক্ষ্যেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। ভবিষ্যতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। তবে মন্দিরের নিয়মিত ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলবে।
এদিকে একই দিনে পলাশবাড়ীতে নির্মাণাধীন রামমূর্তি প্রকল্প সম্পূর্ণভাবে বাতিলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে ইমাম-উলামা পরিষদ। উপজেলা মডেল মসজিদের হলরুমে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা দাবি করেন, এত বড় পরিসরের মূর্তি নির্মাণ স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ, নিরাপত্তাহীনতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ইমাম-উলামা পরিষদের জেলা সেক্রেটারি মুফতি মানছুর রহমান খান লিখিত বক্তব্যে বলেন, পলাশবাড়ীর হোসেনপুর ইউনিয়নে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোগের খবর স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তিনি দাবি করেন, প্রকল্পটি ভবিষ্যতে সামাজিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ হতে পারে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

রামমূর্তি নির্মাণ বন্ধের দাবিতে বুধবার বিকালে স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করা হয়
৮ দফা দাবিগুলো হলো- নির্মাণাধীন ওই বৃহৎ রামমূতি প্রকল্পের সকল কার্যক্রম বন্ধ করে প্রকল্পটির অর্থায়নের উৎস, ব্যয়ের পরিমাণ, দেশি-বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পরিচালনা করার দাবি জানান। সেইসাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, সম্পদের উৎস, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্যাদি আইনানুগভাবে তদন্ত ও নিরীক্ষার আওতায় আনা, কোনও বিদেশি রাষ্ট্র, সংস্থা বা ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অর্থায়ন, প্রভাব বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা তা গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা, প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে দেশের সার্বভৌমম্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িকতা সম্প্রীতির জন্য কোনও ঝুঁকি রয়েছে কিনা তা বিশেষভাবে তদন্ত করা হোক, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রচলিত অভিযোগসমূহ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা, ওই প্রকল্পের সঙ্গে বিদেশি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ বা আলোচনা সত্য কিনা তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করা হোক, তদন্তে যদি কোনও বিদেশি হস্তক্ষেপ, অনভিপ্রেত প্রভাব বিস্তার বা কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বিদেশি মিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ ও ব্যাখ্যা চাওয়ার ব্যবস্থা করা এবং গাইবান্ধা জেলা ও রংপুর বিভাগের শান্তি-শৃংখলা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমম্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সকল কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। বুধবার উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সামাজিক শান্তি এবং সহাবস্থান নিশ্চিত করতে একটি সম্প্রীতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ জাবের আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আবুল কাওছার মো. নজরুল ইসলামসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সমাবেশে বক্তারা গুজব, উসকানিমূলক প্রচারণা ও বিভ্রান্তি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মন্দির কমপ্লেক্সের উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণিদাস ওটিএন বাংলাকে জানান, রামমূর্তির নির্মাণকাজ প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী ১৫ জুলাই উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন মহল থেকে তাকে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি মন্দির এলাকায় উসকানিমূলক ঘটনা ঘটানোর আশঙ্কার কথাও তাকে জানানো হয়েছে। এ কারণে নিরাপত্তা জোরদার করতে অতিরিক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রামমূর্তি নির্মাণের সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পর্ক নেই। ছবিঃ সংগৃহীত
“ভারতের সঙ্গে রামমূর্তির কোনো সম্পর্ক নেই”
বিতর্কের জবাবে হরিদাস চন্দ্র তরণিদাস দাবি করেন, রামমূর্তি নির্মাণের সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এটি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ।
তিনি লিখেছেন, তারা বাংলাদেশি নাগরিক এবং বাংলাদেশেই তাদের জন্ম। তাই নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী মন্দিরে রামের বিগ্রহ স্থাপন করাকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পলাশবাড়ীর হোসেনপুর ইউনিয়নে নির্মাণাধীন এই রামমূর্তি প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সেটি এশিয়ার বৃহত্তম রামমূর্তি হিসেবে পরিচিতি পেতে পারত। তবে প্রকল্পটি ঘিরে বিতর্ক, অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়ার কারণে আপাতত এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা এবং প্রশাসনিক পর্যায়ের পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে বলে জানা গেছে।