গত ১৩ জুন রাউজানের বাগোয়ান এলাকায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৬ জুন- চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আবারও আরেক যুবদল নেতাকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ বলছে, গত বছরের আলোচিত যুবদল নেতা ইব্রাহিম হত্যা মামলার আসামি দিদারুল আলমের বিরুদ্ধে এবার রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার সদর ইউনিয়নের যুবদল নেতা মো. ইব্রাহিমকে দোকানে ডেকে নিয়ে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় তদন্ত করে দিদারুল আলমকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। পরে একই বছরের ২০ অক্টোবর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি। এর আগে একটি চুরির মামলাতেও গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বেরিয়ে আসেন দিদারুল।
সর্বশেষ গত ১৩ জুন রাউজানের বাগোয়ান এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরীকে। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দিদারুল আলমের উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।
জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, পুলিশের অভ্যন্তরীণ তথ্যভাণ্ডারে দিদারুল আলমের বিরুদ্ধে অন্তত নয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, ডাকাতি, চুরি ও অন্যান্য অপরাধের মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হলেও তিনি দ্রুত জামিনে মুক্ত হয়ে আসেন।
রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, যুবদল নেতা ইব্রাহিম হত্যা মামলায় দিদারুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। বর্তমানে মাকসুদুল হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
নিহত মাকসুদুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান পিয়ারুল হক চৌধুরীর ছোট ভাই। পরিবার জানিয়েছে, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। এ কারণে এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ ও রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মাকসুদুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যদিও হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি পুলিশ, তবে স্থানীয় পর্যায়ে কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন ও বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জানা গেছে, বেতাগী বাজারসংলগ্ন চম্পাতলী ঘাট এলাকার একটি বালুমহাল এবং রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়নের খেলার ঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী আরেকটি বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করতেন মাকসুদুল। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বালুমহাল ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল।
বেতাগী ইউনিয়নের বাসিন্দা মোখলেছুর রহমান বলেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বালুমহালসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, হামলার সময় পাঁচজন অস্ত্রধারী সরাসরি অংশ নেয়। তাদের মধ্যে দুজনের হাতে শটগান এবং তিনজনের হাতে পিস্তল ছিল। গুলির মুখে প্রাণ বাঁচাতে মাকসুদুল দৌড়ে একটি দোকানের সামনে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছোড়ে। একপর্যায়ে দুই হামলাকারী খুব কাছ থেকে গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।
সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের বেশ কয়েকজনের চেহারা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। একজনের মুখে কালো মুখোশ থাকলেও অন্যদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার সময় হামলাকারীরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে স্থানীয়দের দূরে থাকতে সতর্ক করে এবং দ্রুত দোকানপাট বন্ধ করার নির্দেশ দেয়।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা সবাই স্থানীয় শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানের অনুসারী। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ধামা ইলিয়াস, দিদারুল আলম, আফসার, ইউসুফ ও জাবেদ। এছাড়া সহযোগী হিসেবে আইয়ুব, মোম ইউসুফ ও পারভেজ নামে আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে খুন, সন্ত্রাস, অপহরণসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মামলা দায়ের হয়নি। তবে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মুহাম্মদ জাকির নামে এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা লিখিত এজাহার দাখিল করবেন বলে জানিয়েছেন। সিসিটিভি ফুটেজে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় জাকির নামে একজনকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঘটনার সময় চার থেকে পাঁচজন অস্ত্রধারী উপস্থিত ছিল। জড়িতদের প্রায় সবাইকে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হত্যার পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ আরও স্পষ্ট হবে।
স্থানীয়দের মতে, ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই রাউজানে সহিংসতা বেড়ে গেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের পরিবর্তনের পর এলাকায় নতুন করে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, বালু ব্যবসা এবং রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী।
তাদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, গুলিবর্ষণ, অপহরণ, বাড়িতে ঢুকে হত্যা এবং চলন্ত গাড়িতে হামলার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় মানুষের চলাচল কমে গেছে এবং অভিভাবকরা সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকাণ্ডসহ গত ২২ মাসে রাউজানে অন্তত ২৫টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের বড় অংশ রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার এবং সন্ত্রাসী দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিহতদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীও রয়েছেন।
মাকসুদুল হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি হাসান মোহাম্মদ জসিম বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়। সমাজ ও রাজনীতিকে সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে সব পক্ষকে দাগি সন্ত্রাসীদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।