বাংলাদেশ-তুরস্ক প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নতুন অধ্যায়, যৌথ অস্ত্র উৎপাদনের পথে দুই দেশ ।ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৬ জুন- বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুন মাত্রা পেতে যাচ্ছে। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও সামরিক প্রযুক্তি কেনাবেচার সম্পর্ক ছাড়িয়ে এবার যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের দিকেও এগোচ্ছে ঢাকা ও আঙ্কারা। সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের ঢাকা সফরের পর দুই দেশের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা সামরিক সহযোগিতা এখন কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করেছে। যদিও সাম্প্রতিক সফরে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারক সই হয়নি, তবুও দুই দেশ প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি গঠন এবং বার্ষিক ‘টু প্লাস টু’ বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে একমত হয়েছে। এতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে এই সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ড্রোন প্রযুক্তি। ২০২২ সালে তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান বায়কার টেকনোলজির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ বায়রাকতার টিবি-২ যুদ্ধ ড্রোন সংগ্রহ শুরু করে। পরে এসব ড্রোন সেনাবাহিনীর কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি তুরস্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রকেটসানের তৈরি টিআরজি-৩০০ কাপলান গাইডেড রকেট সিস্টেমও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডারে যুক্ত হয়েছে।
সামরিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তুরস্ক থেকে কোবরা সাঁজোয়া যান, মাইন-প্রতিরোধী যান, বহুমাত্রিক রকেট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আধুনিক নজরদারি রাডারসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে। একই সঙ্গে তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশি সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য তুরস্কে বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।
সাম্প্রতিক আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের সম্ভাবনা। কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোন, সাঁজোয়া যান, ট্যাংক এবং ইলেকট্রনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম যৌথভাবে উৎপাদনের বিষয়ে দুই দেশ আলোচনা করছে। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির এ সহযোগিতাকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে সামরিক বিশ্লেষক মেজর (অব.) মো. এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, তুরস্কের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে এবং ভবিষ্যতে পাকিস্তান-চীনের যৌথ বিমান উৎপাদন মডেলের মতো একটি কাঠামো গড়ে উঠতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের মতে, ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে অস্ত্রের উৎস বৈচিত্র্যময় করা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। তুলনামূলক কম খরচে উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের পাশাপাশি উৎপাদন প্রযুক্তি অর্জন করলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্প উপকৃত হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যৌথ উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, বড় ধরনের বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে। এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। তবুও সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশ শুধু অস্ত্র ক্রেতা হিসেবেই নয়, বরং ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী দেশ হিসেবেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়।
অন্যদিকে তুরস্ক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা বাজারে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন এই অধ্যায় ভবিষ্যতে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।