আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৩ জুন- বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ, নিবন্ধন স্থগিত এবং শীর্ষ নেতাদের অনেকেই কারাগারে বা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এ পরিস্থিতি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের সংকট নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও কৌশলগত গতিপথের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের প্রধান বাহন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দলটির নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের যে সাংবিধানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, আওয়ামী লীগকে তার অন্যতম প্রধান রূপকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের ইতিহাস কেবল অতীতের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। দীর্ঘ সময় ধরে দলটি ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক ইসলামের আদর্শ, পাকিস্তানপন্থী জাতীয়তাবাদ এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারাও দেশে সমান্তরালভাবে সক্রিয় ছিল। এই দুই ধারার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ছাড়াও সীমান্ত নিরাপত্তা, উগ্রবাদ মোকাবিলা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির ওপরও প্রভাব ফেলে।

৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা আওয়ামী লীগের । ছবিঃ সংগৃহীত
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। এ সময় দারিদ্র্যের হার কমেছে, নারী শিক্ষায় ও কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ বেড়েছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথও এ সময়েই সুগম হয়। গত এক দশকে এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির অন্যতম ছিল বাংলাদেশ।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পকেও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। রাশিয়ার সহায়তায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্প বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হয়। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতাও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আরও দৃঢ় হয়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব অর্জনের কৃতিত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তবে এগুলো ধারাবাহিক নীতিনির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার ফল। ফলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে হঠাৎ করে নিষিদ্ধ করা বা রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রভাব কেবল দলটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো দেশের সবচেয়ে বড় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিলে সেখানে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা দীর্ঘদিন খালি থাকে না। সেই জায়গা অন্য রাজনৈতিক শক্তি দখল করে নেয়। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে বড় মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রান্তিক করে দেওয়ার ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধি পাওয়ার একাধিক উদাহরণ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহাল, গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের মুক্তি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা মামলাগুলো প্রত্যাহার এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। দলটির অবস্থান হলো, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জনগণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রাষ্ট্র। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভারতের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতা এবং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা এক বিষয়, আর দলটিকে স্থায়ীভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
তারা মনে করেন, ৭৭ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। সামরিক শাসন, রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্বাসন এবং নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেও আওয়ামী লীগ টিকে ছিল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন ও আধুনিকায়নের ইতিহাসে দলটির ভূমিকা অস্বীকার করা কঠিন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চূড়ান্ত অধিকার বাংলাদেশের জনগণের। বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণকে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হলে একটি রাজনৈতিক বিরোধ বৃহত্তর জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে। আর এমন পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সূত্রঃ স্টার নিউজ গ্লোবাল