মেলবোর্ন, ২৩ জুন- মিয়ানমারে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ছয় মাসে অন্তত ৭০২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব মৃত্যুর জন্য দেশটির সামরিক বাহিনীকে দায়ী করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের প্রস্তুতির সময় সহিংসতা ও বিমান হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে ২২৪ জন নারী এবং ১৫৩ জন শিশু রয়েছে। এই সময়জুড়ে সামরিক বাহিনীর বিমান হামলাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক সরকার নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা ও সংঘাত বেড়ে যায়। বিশেষ করে সাগাইং অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে অন্তত ১৯১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬০ জন নারী এবং ৩০ জন শিশু রয়েছে।
গত অক্টোবরে সাগাইং অঞ্চলের চাউং-ইউ এলাকায় একটি স্কুলের সামনে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর বিমান হামলার ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ। ওই হামলায় চার শিশুসহ অন্তত ২৩ জন নিহত এবং ৬০ জনের বেশি আহত হন। নিহতরা বৌদ্ধ ধর্মীয় উপবাসের সমাপ্তি উদযাপন করছিলেন এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি ও সামরিক সরকারের নির্বাচনী পরিকল্পনার বিরোধিতায় অবস্থান নিয়েছিলেন।
এ ছাড়া গত ডিসেম্বরে সাগাইংয়ের তাবায়িন এলাকায় একটি চায়ের দোকানে ফুটবল খেলা দেখতে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর বিমান হামলায় অন্তত ১৯ জন নিহত হন। এই ঘটনাগুলোকে বেসামরিক জনগণের ওপর নির্বিচার হামলার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ।
প্রতিবেদনে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গারা হত্যা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, যৌন সহিংসতা এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়ার চাপের মুখে রয়েছেন। তাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত নাজুক বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেছেন, মিয়ানমারের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে সামরিক শাসনের কারণে ভয়াবহ দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এরপর থেকেই দেশটিতে ব্যাপক সংঘাত ও গৃহযুদ্ধ চলছে। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই সংকটে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লাখো মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ সংকট হিসেবে বিবেচনা করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।