ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অস্ট্রেলিয়া সফরের মধ্যেই ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ডে (NIIF) অতিরিক্ত ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয় অস্ট্রেলিয়ানসুপার। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। Photo: Facebook
মেলবোর্ন, ১১ জুলাই : অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম সুপারঅ্যানুয়েশন (অবসর সঞ্চয়) তহবিল AustralianSuper ভারতের National Investment and Infrastructure Fund (NIIF)-এ অতিরিক্ত ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে ভারতীয় অবকাঠামো খাতে তহবিলটির মোট বিনিয়োগ দাঁড়াবে ৭৪ কোটি মার্কিন ডলারে।
বৃহস্পতিবার মেলবোর্নে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে স্বাগত জানিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এই বিনিয়োগকে স্বাগত জানান।
আলবানিজ বলেন, “আজ সকালে AustralianSuper ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ডে অতিরিক্ত ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে—এটি আমি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই।”
নরেন্দ্র মোদিও এই বিনিয়োগকে ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সংস্কারের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভারত-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্ক আরও গভীর
সম্প্রতি ভারত অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসীদের অন্যতম বৃহৎ উৎসে পরিণত হয়েছে। দেশটিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখে পৌঁছেছে।
মেলবোর্ন সফরে দুই দেশের নেতারা প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং পারমাণবিক জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একাধিক সমঝোতায় পৌঁছান। অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারতে ইউরেনিয়াম রপ্তানির বিষয়েও একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
কেন বিতর্ক?
AustralianSuper সাত বছর আগে NIIF-এ প্রথম ২৪ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছিল। তহবিলটির দাবি, সেটি তাদের অন্যতম সফল অবকাঠামো বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অনুকূল জনমিতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে অনেক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ভারতকে আকর্ষণীয় বাজার হিসেবে বিবেচনা করেন।
তবে এই নতুন বিনিয়োগ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় সমালোচনা শুরু হয়েছে।
রক্ষণশীল ভাষ্যকার প্রু ম্যাকসুইন অভিযোগ করেন, অস্ট্রেলিয়ানদের অবসরকালীন সঞ্চয়ের অর্থ ভারতের পরিবর্তে দেশের সড়ক, সেতু ও অন্যান্য জরুরি অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করা উচিত ছিল।
তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, অস্ট্রেলিয়ানসুপারের এই অর্থ দেশের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা যেত, কিন্তু তা ভারতের উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
AustralianSuper-এর জবাব
সমালোচনার জবাবে AustralianSuper জানায়, তারা ইতোমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন কোম্পানিতে ১৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে, যা দেশীয় কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে সমর্থন করছে।
তহবিলটির এক মুখপাত্র বলেন, সদস্যদের সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজারেও বিনিয়োগ করে থাকে।
তিনি আরও বলেন, “সরকারের উচিত নয় সুপার ফান্ডগুলোকে বলে দেওয়া যে সদস্যদের অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করতে হবে। আমাদের দায়িত্ব হলো সদস্যদের অবসর জীবনের জন্য সর্বোত্তম আয় নিশ্চিত করা।”
সুপার তহবিল নিয়ে পুরোনো বিতর্ক
অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে—৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সুপারঅ্যানুয়েশন তহবিল কি সরকারের অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যবহৃত হওয়া উচিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপার ফান্ডগুলোর আইনগত দায়িত্ব হলো সদস্যদের জন্য সর্বোচ্চ ঝুঁকি-সমন্বিত মুনাফা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব তহবিল ব্যবহারের চেষ্টা ভবিষ্যতে অবসরকালীন সঞ্চয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এএমপি (AMP)-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ শেন অলিভার বলেন, স্কুল, হাসপাতাল বা সরকারি প্রকল্পে অর্থায়ন করা সরকারের দায়িত্ব, সুপার তহবিলের নয়। তাঁর মতে, এসব তহবিল রাজনীতিবিদদের প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থভান্ডার হতে পারে না।
ভারতের জন্য অস্ট্রেলিয়ার আরেক আর্থিক সহায়তা নিয়েও প্রশ্ন
AustralianSuper-এর এই বিনিয়োগের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার সরকারি সংস্থা Export Finance Australia (EFA) গত বছর ভারত সরকারের মালিকানাধীন Power Finance Corporation-কে ২৫ কোটি ৮০ লাখ ডলারের ঋণ অনুমোদন করায়ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী জোটের নেতারা অভিযোগ করেছেন, দেশীয় জ্বালানি সংকটের সময় ভারতীয় প্রকল্পে অর্থায়নের যৌক্তিকতা নেই এবং সরকারি অর্থায়নের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি ও ব্যবসার স্বার্থ রক্ষা।