সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন । ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১২ জুন- সাবেক স্পিকার, সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার আর নেই। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগে রোববার (১২ জুলাই) ভোর ৪টা ১৯ মিনিটে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
বিএনপির নেতা ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশের আইন, রাজনীতি এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর তৎকালীন জলপাইগুড়ি জেলার, বর্তমান পঞ্চগড় জেলার তেতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জমির উদ্দিন সরকার। তাঁর বাবা ছিলেন মৌলভী আলী বক্স এবং মা বেগম ফখরুন্নেছা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। পরে ১৯৬০ সালে আইন পেশায় যোগ দেন এবং ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যে গিয়ে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল ডিগ্রি লাভ করেন।
দেশে ফিরে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন বিষয়ে দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে আইন পেশা পরিচালনা করেন। আইনজীবী হিসেবে তাঁর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা তাঁকে দেশের অন্যতম খ্যাতিমান আইনবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
রাজনৈতিক জীবনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উদ্যোগে সক্রিয় হন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার পর তিনি দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন এবং দীর্ঘ সময় দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিভিন্ন সময়ে ভূমি, শিক্ষা, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন।
স্পিকার হিসেবে সংসদ পরিচালনায় নিরপেক্ষতা, সংসদীয় রীতি-নীতি অনুসরণ এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। এছাড়া ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
আইন ও রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিষয়েও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। আন্তর্জাতিক আইন, সমুদ্র আইন, জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। শিক্ষার প্রসারে অবদান রাখতে নিজ জেলা পঞ্চগড়ে প্রতিষ্ঠা করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কলেজিয়েট ইনস্টিটিউট।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বেগম নুর আখতারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের এক মেয়ে ও দুই ছেলে রয়েছেন। দুই ছেলেই ব্যারিস্টার হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত।
দীর্ঘ কর্মময় জীবনে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার দেশের আইনব্যবস্থা, সংসদীয় গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, আইনজীবী সমাজ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো একজন অভিজ্ঞ ও প্রবীণ ব্যক্তিত্বকে হারাল।