শর্তসাপেক্ষে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিত সরকারের
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশের সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তবে এ ধরনের প্রক্রিয়া শুরুর আগে…
মেলবোর্ন, ১৩ জুলাই- ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণা হলো সত্য লুকানো। আর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো বিকৃত ইতিহাস। কারণ বিকৃত ইতিহাস জাতিকে বারবার ধোঁকা দেয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেল, তার প্রতিটি মুহূর্ত এখনও আমাদের সামনে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গণভবনের দরজা ভেঙেছে, রেজিম বদলেছে, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। ক্ষমতার মুখোশ খুলে সত্য উন্মোচন করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দায়।
সম্প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সাক্ষাৎকারে ঘোষণা দিয়েছেন, “ডিসেম্বরে তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন”। এই একটি বাক্যই এখন দেশের রাজনীতির সব হিসাব পাল্টে দিচ্ছে।
বর্তমান সরকারের অনেকেই বলেন “আওয়ামী লীগ নাই”। প্রচারও চলছে প্রতিদিন। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলাদেশের এমন কোনো গ্রাম, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন নেই যেখানে এই দলের সাংগঠনিক শেকড় নেই। এটি কোটি মানুষের দল। ১৯৪৯ সাল থেকে ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার – রাষ্ট্রের প্রতিটি বাঁকে এই দলের নাম জড়িয়ে আছে।
একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কোটি মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় মুছে ফেলা যায় না। যদি তিনি নেতাকর্মীদের নিয়ে ফেরেন এবং আইনের মুখোমুখি হন, তবে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। বর্তমান কারাগারের ধারণক্ষমতা, আইনি প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা – সবকিছুই নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ রাজনীতি প্রতিহিংসা দিয়ে চলে না, চলে সংবিধান দিয়ে।
যারা তাকে কাছ থেকে দেখেছেন তারা বলেন, তাঁর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর মতো “একরোখা জেদ” আছে। দেশ ও মানুষের প্রতি টান আছে। তিনি বলেছেন দেশের মানুষের জন্যই তিনি ফিরবেন। রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
২০২৪ এর জুলাই-আগস্ট। কোটা সংস্কার দিয়ে শুরু হয়ে যা শেষ হলো সরকার পতনে। কিছু গুরুতর অভিযোগও উঠে এসেছে।
এর মধ্যে অন্যতম টিভির টকশো আলোচনায় গভীর একটা বিষয় উঠেছে “জুলাই আন্দোলনে ট্রাক ভর্তি করে ঢাকায় কয়েক লাখ রোহিঙ্গাদের আনা হয়েছিল, আন্দোলনে ব্যবহার করা হয়েছিল”।
যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি শুধু রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র না, এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন। রোহিঙ্গারা আমাদের মানবিক আশ্রয়ের প্রতীক। তাদেরকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।
আর যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, তবে এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। সিসিটিভি ফুটেজ, ট্রাকের রুট, মোবাইল লোকেশন – সবকিছু জনগণের সামনে আসা দরকার। কারণ ইতিহাস বলে, প্রতিটি বড় আন্দোলনে ৩য় পক্ষ ঢুকে তাকে সহিংস করার চেষ্টা করে। সত্য গোপন থাকলে ইতিহাস বিকৃত হয়।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তথ্য যাচাই না করে প্রচার। বিশেষজ্ঞের কথা মানেই সত্য – এই ধারণা সাংবাদিকতাকে অসুস্থ করে তুলছে।
গত ৬ জুলাই “দেশ রূপান্তর” পত্রিকায় দেশের খ্যাতিমান আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘এ পর্যন্ত শুধু শুনেই আসছি আওয়ামী লীগের বিচার করা হবে। অথচ কোন আইনে, কোন অপরাধে বিচার হবে সেটি স্পষ্ট করে কারও মুখে শুনিনি। পৃথিবীতে কোনো দলকে বিচারের মুখোমুখি করা ও আদালতের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করার নজির আমার জানা নেই’।
তিনি নিজেই বলেছেন “আমার জানা নেই”। তাই পত্রিকার দায়িত্ব ছিল এই বক্তব্য যাচাই করা। কিন্তু যাচাই ছাড়াই ছাপা হলো। এরপর আরও কয়েকটি ওয়েবসাইটে একই কথা কপি-পেস্ট করে প্রচার হলো – “রাজনৈতিক দলকে আদালতের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করার নজির পৃথিবীতে নেই”।
অথচ একটু ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যায়, নজিরের অভাব নেই।
স্পেন ২০০৩ সালে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে “বাতাসুনা” কে, বেলজিয়াম ২০০৪ সালে বর্ণবাদের কারণে “ভ্লামস ব্লক” কে, জার্মানি ১৯৫২ সালে নাৎসি সমর্থক “সোশ্যালিস্ট রাইখ পার্টি” কে, গ্রিস “গোল্ডেন ডন” কে, ইউক্রেন রাশিয়াপন্থি দলগুলোকে, দক্ষিণ কোরিয়া “ইউনিফাইড প্রোগ্রেসিভ পার্টি” কে, কম্বোডিয়া গণহত্যার দায়ে “খেমারুজ পার্টি” কে আদালত ও সংসদের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করেছে।
আমরা এখানে কর্তৃত্ববাদী দেশের উদাহরণ দিচ্ছি না। দিচ্ছি আধুনিক উদার গণতন্ত্রের উদাহরণ। তারপরও যদি বলা হয় “নজির নেই”, তবে সেটি হয় অজ্ঞতা, নয়তো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। “উনি বলেছেন, উনার দায়” – এই যুক্তি দিয়ে মিডিয়া দায় এড়াতে পারে না। কারণ মিডিয়াই জনমত তৈরি করে।
কোনো গণআন্দোলনই শুধু দেশের ভেতরের ঘটনা না। ৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে “মায়ের ডাক” এর সমন্বয়ক সানজিদা তুলি এমপি বলেছেন:
“পিটার হাস আমাদের কাছে ‘রিয়েল হিরো’। তাকে ছাড়া জুলাই আন্দোলনের ভিক্টরি সম্ভব ছিল না।” দেশের মানুষ এখন রিয়েল হিরো বিতর্ক দেখতে চায়। সত্য উন্মোচিত হওয়া উচিত।
পিটার হাস যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত। ২০২৪ সালে তিনি মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে সরব ছিলেন। এসবের আড়ালে সরকার পতন গোপনে কাজ করেছে এটা তুলির স্বতঃস্ফূর্ত উঠে এসেছে।
জামায়াতের নেতা সাবেক এমপি মেজর (অব) আখতারুজ্জামান “পূর্ণিয়ার ভিউ” তে বলেছেন:
“আমেরিকা ২৯ মিলিয়ন ডলার ইনভেস্ট করেছে শেখ হাসিনার সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য।”
এখানে কিছু প্রশ্ন। এক: USAID, NED এর ফান্ডের স্বচ্ছ অডিট কোথায়? সেই টাকা “প্রজেক্টের” জন্য ছিল নাকি “রেজিম চেঞ্জের” জন্য?
আমার দাবি: অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক। কে কত টাকা পেল, কোথায় খরচ হলো – শ্বেতপত্র প্রকাশ হোক।
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা যায়, কিন্তু রাজনৈতিক চিন্তা নিষিদ্ধ করা যায় না। আইন দিয়ে বিচার করুন, কিন্তু সংবিধান মেনে।
শেখ হাসিনা ফিরবেন কি না, আদালত কী রায় দেবে – সেটি সময় ঠিক করবে। কিন্তু আমাদের দায়িত্ব হলো ইতিহাসকে সত্য আকারে লিখে রাখা।
শেষ করি নিজের দুই লাইন কবিতা দিয়ে:
“মুখোশ পরে ক্ষমতা বেশিদিন টেকে না,
সত্যের আলোয় একদিন সব দেয়ালই ভাঙে।”
জনগণই শেষ কথা বলবে।

সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত
লেখক-
সরদার সেলিম রেজা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কবি ও পরিবেশ কর্মী,
সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au