মেসির জাদুতে সেমিতে আর্জেন্টিনা, উচ্ছ্বসিত স্কালোনি। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১২ জুলাই- যদি আর্জেন্টিনা ফাইনালে যায় তাহলে লিওয়েন মেসির আর তিনটি ম্যাচ রয়েছে বিশ্বকাপে। তাকে আর আমরা এরপর বিশ্বকাপে পাবো না। ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বিরল প্লেমেকারকে আর খেলতে দেখবেন না- এটিই হওয়া উচিত আপনার সমস্ত ফুটবলীয় আবেগ। কাজেই যারা ফুটবলের ফ্যান নয়, যারা মেসি বিদ্বেষী তাদের ট্রল গুজব বিদ্বেষে চোখ না দিয়ে আপনারা মেসির খেলাটাই উপভোগ করুন। মেসি কি পারে, মেসি কে, কি সে করেছে, এগুলো কিছু মানুষের বিদ্বেষে কিছুই যাবে আসবে না। কারোর সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে লাভ নেই। কাউকে জবাব দেয়ার কিছু নেই। সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। ফুটবল তার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে তার মর্যাদা দিয়েছে। ব্যাক টু ব্যাক বিশ্বকাপ জয়ের শংকায় তারা এই রকম করছে। তাদের ভয় মেসি আবার বিশ্বকাপ জিতলে তারা সহ্য করবে কিভাবে!
অথচ মেসির প্রতি তাদের রাগের কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। ব্রাজিল বা পুর্তোগিজকে হারিয়েও আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেনি। ৯০ সালের পর তাদের সঙ্গে বিশ্বকাপে খেলাই হয়নি আর্জেন্টিনার। মেসির সঙ্গে সব গ্রেট ব্রাজিলিয়ানদের সম্পর্ক মধুর। নেইমার তার বন্ধু। কোপা জয়ের পর মেসির সঙ্গে নেইমারের দীর্ঘ আলাপ আমরা দেখেছি ক্যামেরায়। কি কারণে তাহলে এত মেসি বিদ্বেষ? তাহলে একটু পেছনে যেতে হবে আমাদেরকে।
লাতিন আমেরিকার ফুটবল আমাদের উপমহাদেশে রাজনৈতিক বিবেচনায় পক্ষপাতমূলক সমর্থন পেয়েছে। পশ্চিমাদের প্রতি এখনকার বুদ্ধিজীবীদের ছিল বামপন্থী বিদ্বেষ। লাতিন আমেরিকা ছিল ইউরোপীয়ান উপনিবেশ। ৮৬ সালের আগ পর্যন্ত কেউ টেলিভিশনে বিশ্বকাপ দেখেনি। রেডিও সংবাদপত্র ছাড়া কোন সোর্স ছিল না। সেকালের ব্রাজিল ছিল সত্যিই সব কিংবদন্তিতুল্য খেলোয়াড়। পশ্চিমা দেশগুলোকে হারিয়ে তাদের জয় ছিল আমাদের এখানেও একটা রাজনৈতিক জয়ের মত। সে পর্যন্ত ফুটবল মানেই এখানে ছিল ব্রাজিল। ব্রাজিল এখানে কুলিণ ফুটবল হিসেবে কাল্টে পরিণত হয়। এই কাল্ট ব্রাজিলের কোন দোষ ত্রুটি টিনের চশমায় পড়ে দেখা হতো না। বরাবর ফিফাকে দোষারোপ এখানে বেশ জনপ্রিয় ছিল।
৮৬ সালে একজন খেলোয়াড় এলেন আকাশী সাদা জার্সি পরে। প্রথম বিশ্বকাপের রানাসআপ আর্জেন্টিনার সেই ছোটখাটো আবেগী মানুষটিকে প্রথমবারই উপমহাদেশের মানুষ দেখলো তাই নয়, ফুটবল বিশ্বকাপটাই প্রথমবারের মত সরাসরি দেখতে পেলো। এক অতিমানবীয় বিশ্বকাপ, অলৌকিক এক বিশ্বকাপ, ওয়ানম্যান শো বিশ্বকাপ দেখলো মানুষ। তার নাম দিয়েগো ম্যারাদোনা! কোটি কোটি মানুষ সেই শিল্পীর ফুটবল দেখতে পেলো যা এতকাল তারা কেবল ব্রাজিলের নামে শুনেছে- আজ মানুষ নিজের চোখে দেখলো সেটা। দলটির নাম আর্জেন্টিনা আর সেই বরপুত্রের নাম ম্যারাদোনা। লক্ষ লক্ষ ব্রাজিল ভক্তরা পর্যন্ত তার ফ্যান হয়ে গেলো। একই সঙ্গে লক্ষ লক্ষ ব্রাজিল ফ্যানের কুলিণ মাইন্ডে আঘাত লাগলো। এতবড় গ্রেট কেন আর্জেন্টিনায় আসবে? আসতে হলে আসবে ব্রাজিলে! ম্যারাদোনাকে ৮৬ সালের পর পেলে থেকে শুরু করে সব ব্রাজিলিয়ানরা প্রশংসায় ভাসালেন। ব্রাজিলের সঙ্গে কোন বিবাদই নেই। তাহলে ম্যরাদোনা আর আর্জেন্টিনা চোখের বিষ হলো কেন? পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয় সেই ব্রাজিলের ফ্যানরা মেনে নিতে পারলো না। যে পশ্চিমাদের বিরোধীতা করাই এখানে ফ্যাশান তারাই হলে গেলো জার্মানির ফ্যান!
চার বছর পর ৯০ সালের ফাইনালে আবার আর্জেন্টিনা পশ্চিম জার্মানি ফাইনাল। বাজে এক রেফারিংয়ের শিকার হয়ে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। এই অন্যায়ের জন্য ম্যারাদোনার কান্নাকে এদেশের একজন সাহিত্যিক শিল্পের কান্না বলেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমাদের সহজাত শত্রু মনে করা কিছু মানুষ সেদিন জার্মানির এই জয়ের লুঙ্গি ড্যান্স দিয়েছিল। কি কারণ, কেন আর্জেন্টিনার প্রতি তাদের এত রাগ? কারণ কেন এত বড় প্রতিভা ব্রাজিলের বাইরে জন্ম নিবে। তাদের কুলিণতা কেড়ে নিয়েছে ম্যারাদোনা। লাতিন শৈল্পিক ফুটবল যে এখন আর্জেন্টিনা খেলে!
সেই থেকে শুরু। তার চলমান রূপ মেসির প্রতি নোংরা বিদ্বেষ। অথচ ৮টি কোয়াটার ফাইনালিস্টদের মধ্যে একটি আফ্রিকার একটি লাতিন বাকী ছয়টি ইউরোপের টিম। হিসেব মতে তো তাদের লাতিনের পক্ষে থাকার কথা! ইউরোপের ফুটবলই ফুটবলের আজকের জাঁকজমকতার রসদ জুগিয়ে থাকে। ফিফা তাদেরকে বাদ দিয়ে দুর্বল অর্থনীতি ও দুর্বল ঘরোয়া ফুটবলের একটি দেশকে নাকি চ্যাম্পিয়ন করার জন্য চোট্টামি করে! ইউরোপকে চ্যাম্পিয়ান করাই তো ফিফার লক্ষ হবার কথা। ইউরোপ ফুটবলে জোয়ার আনবে তাতে। সেই কবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইংলিশরা। যাদের প্রিমিয়ার লীগ বিশ্ব ফুটবলে সবচেয়ে জমজমাট ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ফুটবলের অর্থের জন্য ইংলেন্ড স্পেন জার্মানি ইতালির ঘরোয়া ফুটবলের অবদান কতখানি সেটা ফুটবলের খোঁজখবর রাখেন তারা জানেন। সেই ইতালি ১২ বছর ধরে বিশ্বকাপে আসতে পারে না সেখানে ফিফা কিছু করে না কেন? ইতালির না থাকা কি বিশ্বকাপের রঙ একটু হলেও হারায় না?
এসব কথার কোন উত্তর তাদের নেই। তাদের সেই রোষ- কেন মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে খেলে! কেন এই এলিয়েন ফুটবলার একটা দলকে বিশ্বজয়ে নিয়ে যায়। কেন এই মানুষটির জন্য তার দল জীবন দিতেও প্রস্তুত! এটাই তাদের রাগ! অন্ধ বিদ্বেষ। তাই বলবো, এসব বিদ্বেষের জবাব দিয়ে সময় নষ্ট না করে এই মহান খেলোয়াড়টির শেষ বিশ্বকাপ দুচোখ ভরে উপভোগ করুন। ব্যাক টু ব্যাক ফাইনাল ও বিশ্বকাপ জয়কে উপভোগ করুন।
লেখক-সুষুপ্ত পাঠক