মেলবোর্ন, ২৪ জুলাই: নিকারাগুয়ার সরকার নিয়ন্ত্রিত জাতীয় পরিষদে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে ভবিষ্যতের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে একটি নতুন আইন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহে এ প্রস্তাবের ওপর ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা আরও সীমিত হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগার সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য। কয়েক দিন আগে তিনি বলেন, “সরকার দখল বা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের জন্য আর কোনো নির্বাচন হবে না।” তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক ওর্তেগার বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছেন, নিকারাগুয়ার সব রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিকের ভোট দেওয়া এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা উচিত।
৮০ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগা ২০০৭ সাল থেকে টানা ক্ষমতায় রয়েছেন। তার শাসনামলে বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার, নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা এবং অনেকের নাগরিকত্ব বাতিলের অভিযোগ বহুবার উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
গত রোববার ১৯৭৯ সালের সানদিনিস্তা বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে ওর্তেগা বিরোধীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত বিরোধী গোষ্ঠীগুলো সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছে এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড ঠেকাতে নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ওর্তেগার বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ওর্তেগার বক্তব্য তার সরকারের প্রকৃত কর্তৃত্ববাদী চরিত্রকে প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ওর্তেগা এবং তার স্ত্রী রোসারিও মুরিয়ো, যাকে ২০২৫ সালে সহ-রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়েছে, এখন আর জনসমর্থনের ভান করতেও আগ্রহী নন।
অন্যদিকে, নিকারাগুয়ার জাতীয় পরিষদের প্রধান গুস্তাভো পোররাস আন্তর্জাতিক সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, আইনসভা এবং দেশটির সর্বোচ্চ নির্বাচন কর্তৃপক্ষ এমন একটি কাঠামো নিয়ে কাজ করছে, যাতে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ সীমিত করা যায়।
২০২১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের গ্রেপ্তার, নির্বাচন থেকে অযোগ্য ঘোষণা অথবা দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। ফলে নির্বাচনে কেবল কয়েকজন কম পরিচিত প্রার্থী অংশ নেন, যাদের বড় ধরনের জনসমর্থন ছিল না।
এরই মধ্যে ২০২৫ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে ছয় বছর করা হয়েছে। একই সঙ্গে রোসারিও মুরিয়োকে সহ-রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে সহজেই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন।
২০১৮ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর থেকেই নিকারাগুয়ায় সরকারবিরোধী রাজনীতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে নির্বাসনে থাকা বিরোধী নেতা হুয়ান সেবাস্তিয়ান চামোরো বলেন, নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে নিকারাগুয়াকে চীন, উত্তর কোরিয়া ও কিউবার মতো একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। সাবেক বিরোধী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ফেলিক্স মারাদিয়াগাও বলেন, সরকারের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে বিরোধী মত ও জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রেসিডেন্ট ওর্তেগা এখনো ভয় পান।
সুত্রঃ বিবিসি