বিশ্ব

কেন যন্তর মন্তরের কিছু বিক্ষোভকারী মুখ ঢেকে রাখছেন

  • 1:44 am - July 25, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৭ বার
যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের অনেকে মুখোশ পরে বিক্ষোভ করছেনফাইল ছবি: রয়টার্স

মেলবোর্ন, ২৫ জুলাই: ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চলমান ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল যন্তর মন্তরের কাছে কেরালা হাউস ভবনের বাইরে দিল্লি পুলিশের দুটি অত্যাধুনিক নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ যান মোতায়েন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে।

দিল্লি পুলিশের মোতায়েন করা বড় যানটির নাম ‘মোবাইল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ভেহিকেল’। সেখানে অবস্থানরত দিল্লি পুলিশের সদস্যরা আন্দোলনস্থলে স্থাপিত বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে পাওয়া সরাসরি ভিডিও ফুটেজগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন। এর ঠিক বিপরীতে আছে অপেক্ষাকৃত ছোট যান। এর নাম ‘ইক্ষণ’।

ইক্ষণ একটি সংস্কৃত শব্দ। এর অর্থ—দেখা বা পর্যবেক্ষণ করা। ইক্ষণের দায়িত্বে থাকা দুই কর্মকর্তা ফেসিয়াল রিকগনিশন সফটওয়্যার (চেহারা শনাক্তকারী সফটওয়্যার) ব্যবহার করে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) পরিচালিত এ সফটওয়্যার প্রতিটি মুখের চারপাশে সবুজ বক্স তৈরি করে এবং সেগুলো পুলিশের তথ্যভান্ডারে থাকা অপরাধীদের তথ্য ও ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করে।

২০২৩ সালে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের আগে দিল্লি পুলিশ ‘ইক্ষণ’ যানটি তাদের বহরে যুক্ত করে। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটিকে ‘লাইভ সিসিটিভি নজরদারি যান’ হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছিল। ভ্যানটিতে ৩৬০ ডিগ্রি কোণে নজরদারির জন্য আটটি অত্যাধুনিক ক্যামেরা রয়েছে। প্রশিক্ষিত সিসিটিভি অপারেটররা এটি পরিচালনা করেন।

আন্দোলনস্থলে বিক্ষোভকারীদের ওপর লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন অর্থাৎ সরাসরি চেহারা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দিল্লি পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। তাঁর দাবি, পরিচিত কোনো অপরাধীকে শনাক্ত করাই এর উদ্দেশ্য।

গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় ওই কর্মকর্তা তাঁর নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘অপরাধীদের ছবিসংবলিত একটি বড় তথ্যভান্ডার আমাদের কাছে আছে। তাই এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে পাওয়া ফুটেজে চেহারা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা হয়, সফটওয়্যারটি আমাদের অপরাধী তথ্যভান্ডারে থাকা কারও সঙ্গে কোনো মুখের মিল খুঁজে পায় কি না।’

তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের দাবি, পুলিশের এ অব্যাহত নজরদারি তাঁদের মধ্যে ভীতি তৈরি করছে। ভবিষ্যতে রোষানলে পড়ার আশঙ্কায় অনেকে মুখ ঢেকে বিক্ষোভে অংশ নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

২০২৩ সালে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের আগে দিল্লি পুলিশ ‘ইক্ষণ’ যানটি তাদের বহরে যুক্ত করে। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটিকে ‘লাইভ সিসিটিভি নজরদারি যান’ হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছিল। ভ্যানটিতে ৩৬০ ডিগ্রি কোণে নজরদারির জন্য আটটি অত্যাধুনিক ক্যামেরা রয়েছে। প্রশিক্ষিত সিসিটিভি অপারেটররা এটি পরিচালনা করেন। দিল্লিতে ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন রাজস্থানের এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘আমি ও আমার বন্ধুরা আন্দোলনের জন্য দারুণ সব পোস্টার বানিয়েছি। কিন্তু ক্যামেরা দিয়ে সারাক্ষণ আমাদের পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে। এ জন্য পোস্টার ধরার সময় আমাদের মুখ ঢেকে রাখতে হচ্ছে। আমরা সবাই সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তাই পুলিশের তথ্যভান্ডারে আমাদের পরিচয় সংরক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি নিতে চাই না।’

মুখ ঢেকে রাখা আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘পুলিশ যে ভিডিও ধারণ করছে, সেখানে আমার স্লোগান দেওয়া বা পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য যদি কোনোভাবে আমার মা–বাবার কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে কী হবে? আমি যে এখানে এসেছি, তা তাঁরা জানেন না। আমি কেন এ আন্দোলনে অংশ নিচ্ছি, সেটাই তাঁরা বোঝেন না।’

দিল্লি পুলিশের আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আন্দোলনের সময় ধারণ করা ভিডিও কত দিন সংরক্ষণ করা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ডেটা সংরক্ষণ নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে না। এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আন্দোলনে যদি কোনো বিশৃঙ্খল ঘটনা ঘটে, তাহলে আজই বা তিন মাস পরও সেটি তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে। তদন্ত চালাতে পুলিশের ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ প্রয়োজন হবে, এমনকি তত দিনে আন্দোলন শেষ হয়ে গেলেও। তাই ভিডিওগুলো আমাদের সিস্টেমে কত দিন থাকবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।’

পুলিশের এ অব্যাহত নজরদারি নিয়ে বিক্ষোভকারীদের উদ্বেগ আদালতেও গড়িয়েছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) ছাত্র সংসদের সাবেক সভাপতি আইশে ঘোষ দিল্লি হাইকোর্টে করা এক আবেদনে অভিযোগ করেছেন, দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরবচ্ছিন্ন, নির্বিচার ও অনধিকারমূলক নজরদারি চালিয়েছে। একটি স্থায়ী নজরদারি টাওয়ার স্থাপন এবং সার্বক্ষণিক ভিডিওগ্রাফার মোতায়েনের বিষয়টিও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের ২৪ ঘণ্টার নজরদারি বিক্ষোভকারীদের গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করছে।

যন্তর মন্তরের আশপাশে পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন রাখা হয়েছেফাইল ছবি: এএনআই

২০ জুলাই মামলার শুনানিতে দিল্লি পুলিশের পক্ষে উপস্থিত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা দিল্লি হাইকোর্টকে বলেন, যন্তর মন্তরে ভিডিও ও ছবি ধারণের একমাত্র উদ্দেশ্য আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটি নজরদারি বা গুপ্তচরবৃত্তির জন্য করা হয়নি।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের জবাব চেয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট।

নাগরিকদের ওপর ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি ডিজিটাল পারসোনাল ডেটা প্রটেকশন আইন, ২০২৩-এর আওতায় পড়ে। তবে এ আইনে দিল্লি পুলিশের মতো নিরাপত্তা বাহিনীসহ সরকারি সংস্থাগুলোকে ব্যাপক ছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে আইনে থাকা অনেক সুরক্ষামূলক বিধান তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। ভারতজুড়ে আধুনিক পুলিশি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে ডিজিটাল নজরদারি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন সিসিটিভি ক্যামেরার নেটওয়ার্ক, ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি, ড্রোনভিত্তিক নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এএনপিআর) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভিডিও বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব প্রযুক্তি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আরও কার্যকরভাবে পুলিশি কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করে। তবে নাগরিক অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ব্যক্তিদের মতে, এসব প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার গোপনীয়তা, প্রয়োজনীয়তার সীমা, স্বচ্ছতা ও নজরদারি নিয়ন্ত্রণে পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামোর অভাব নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবস্থা কোনো ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও থেকে মুখমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে সেটিকে একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল টেমপ্লেটে রূপান্তর করে। এরপর সেই টেমপ্লেটকে তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত ছবির সঙ্গে তুলনা করা হয়। মিলের মাত্রা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে সেটিকে সম্ভাব্য মিল হিসেবে শনাক্ত করা হয় এবং পরে আরও যাচাই করা হয়।

২০২২ সালে তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী করা এক আবেদনের জবাবে দিল্লি পুলিশ বলেছিল, তাদের ব্যবস্থাটি ৮০ শতাংশ নির্ভুলতার হার দেখালে সেটিকে ‘ইতিবাচক মিল’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

 

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

এই শাখার আরও খবর

লন্ডনের বিলাসবহুল হোটেলে অতিরিক্ত মাদক ও অ্যালকোহল সেবনে সৌদি প্রিন্সের মৃত্যু

মেলবোর্ন, ২৫ জুলাই: লন্ডনের একটি পাঁচ তারকা বিলাসবহুল হোটেলে অতিরিক্ত মাদক ও অ্যালকোহল সেবনের ফলে সৌদি আরবের ২৯ বছর বয়সী এক প্রিন্সের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর…

রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের দাবি এনসিপির

মেলবোর্ন, ২৫ জুলাই: রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর মো. সাহাবুদ্দিনকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে দলের কেন্দ্রীয়…

ঢাকায় উল্টো রথের যাত্রাপথে বোমা বিষ্ফোরণ, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও উদ্বেগ

মেলবোর্ন, ২৫ জুলাই: ঢাকার মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে একটি ছাতার ভেতরে রাখা বোমা উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরে সেটি নিষ্ক্রিয় করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোমা…

চট্টগ্রামে বন্যায় ১ লাখ ৬১ হাজার পশু ও হাঁস-মুরগির মৃত্যু

মেলবোর্ন, ২৫ জুলাই: চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ তিন পার্বত্য জেলায় সাম্প্রতিক বন্যায় প্রাণিসম্পদ খাতে মোট ৭৭ কোটি ১৫ লাখ ২ হাজার ২৪০ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভয়াবহ এ…

মতিঝিল মেট্রোস্টেশনের নিচে বোমা বিস্ফোরণ, উদ্ধার আরও একটি অবিস্ফোরিত বোমা

মেলবোর্ন, ২৫ জুলাই:   রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের সড়কে পেট্রল বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে আরও একটি অবিস্ফোরিত বোমা…

ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল, নিরাপদ আশ্রয়ে লাখো মানুষের ছুটে চলা

মেলবোর্ন, ২৫ জুলাই:  ইউরোপ জুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ফ্রান্সে উপকূলীয় পর্যটন এলাকা থেকে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au