এইচএসসির ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্র ভুলে ভরা, ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীর।
মেলবোর্ন, ২৭ জুলাই: চলতি বছরের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় ইংরেজি ভার্সনের বিভিন্ন বিষয়ের প্রশ্নপত্রে একের পর এক অনুবাদগত ভুল, তথ্যগত অসঙ্গতি এবং বৈজ্ঞানিক পরিভাষার বিকৃতির অভিযোগ উঠেছে। এসব ত্রুটির কারণে পরীক্ষার্থীরা বিভ্রান্তির মুখে পড়েছেন এবং তারা দাবি করেছেন, একই পরীক্ষায় বাংলামাধ্যমের শিক্ষার্থীদের তুলনায় ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) পরিচালিত ইংরেজি ভার্সনের জন্য আলাদা পাঠ্যক্রম থাকলেও প্রশ্নপত্র প্রস্তুতের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রথমে বাংলায় প্রশ্ন তৈরি করে পরে সাধারণ অনুবাদের মাধ্যমে ইংরেজি সংস্করণ প্রস্তুত করা হয়। বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের পর্যাপ্ত যাচাই না থাকায় অনেক প্রশ্নে আক্ষরিক অনুবাদের কারণে মূল অর্থই পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে।
তারা জানান, ভাষাভিত্তিক বিষয়গুলোতে তেমন সমস্যা না থাকলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের প্রায় সব পরীক্ষাতেই গুরুতর ভুল ধরা পড়েছে। বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান প্রথম ও দ্বিতীয়পত্র এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) পরীক্ষায় এমন সব ত্রুটি ছিল, যা প্রশ্নের মূল ধারণা ও উত্তরের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের বহুনির্বাচনি অংশে একটি প্রশ্নে ‘সরবরাহকৃত শক্তি (Energy)’ শব্দটির পরিবর্তে ইংরেজি ভার্সনে ‘Power’ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে বাংলা ও ইংরেজি প্রশ্নের উত্তর ভিন্ন হয়ে যায়। আবার একটি সৃজনশীল প্রশ্নে ‘Overtone’ ও ‘Beat’ নামে দুটি ভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরিভাষাকে একইভাবে ‘Note’ হিসেবে অনুবাদ করায় পুরো প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিই পরিবর্তিত হয়েছে।
এছাড়া একটি প্রশ্নে ‘এক-তৃতীয়াংশ কমানো হয়েছে’ বাক্যাংশকে ভুলভাবে ‘এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা হয়েছে’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে, যার ফলে গাণিতিক মান সম্পূর্ণ বদলে যায়। অন্য একটি প্রশ্নে বাংলা ভার্সনে একটি ভেক্টরের মান ধনাত্মক (+120ĵ) থাকলেও ইংরেজি ভার্সনে সেটি ঋণাত্মক (-120ĵ) ছাপা হয়েছে।
পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয়পত্রেও একাধিক তথ্য বাদ পড়ার অভিযোগ রয়েছে। একটি প্রশ্নে ‘সাম্যাবস্থা’ (Equilibrium)-এর গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ইংরেজি প্রশ্নপত্রে উল্লেখ করা হয়নি। অন্য একটি প্রশ্নে বাংলা ভার্সনে থাকা ‘P’ বিন্দুর তথ্যও ইংরেজি সংস্করণে অনুপস্থিত ছিল। ফলে একই পরীক্ষায় দুই মাধ্যমে ভিন্ন তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে।
রসায়ন দ্বিতীয়পত্রেও প্রশ্নের ভাষা নিয়ে গুরুতর আপত্তি তুলেছেন শিক্ষকরা। একটি প্রশ্নে শুধু K₂Cr₂O₇-এর উল্লেখ থাকলেও দ্রবণের ঘনমাত্রা, পরিমাণ এবং অ্যাসিডিক মাধ্যমের তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। পাশাপাশি ‘iron ore’-এর পরিবর্তে ‘salt’ শব্দ ব্যবহার করায় প্রশ্নটি বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল ও বিভ্রান্তিকর হয়ে পড়েছে বলে মত দিয়েছেন বিষয় বিশেষজ্ঞরা।
শিক্ষকদের মতে, পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে এ ধরনের অনুবাদ ও তথ্যগত ভুল শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করে এবং পরীক্ষার ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এদিকে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্রে ভাষাগত ও অনুবাদজনিত ত্রুটির অভিযোগ প্রায় প্রতিবছরই উঠে আসে। চলতি বছরের অভিযোগগুলো বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ শাখায় পাঠানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, ভবিষ্যতে ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও যাচাইয়ের জন্য বিষয়ভিত্তিক দক্ষ বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, প্রশ্নপত্রে যেসব ত্রুটি হয়েছে, সেসবের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়টি মূল্যায়নের সময় বিবেচনায় নেওয়া হবে এবং পরীক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় সুবিধা পাবেন।