বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসুস্থতার ছুটির হার শুধু নিয়মের ওপর নির্ভর করে না। ফাইল ছবি
মেলবোর্ন, ২৭ জুলাই: কর্মীদের অসুস্থতার ছুটির নিয়ম আরও কঠোর করতে যাচ্ছে জার্মান সরকার। তবে গবেষকরা বলছেন, এতে সমস্যার মূল কারণের পরিবর্তে শুধু বাহ্যিক লক্ষণ মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সেবা খাতে দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, কম বেতন এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপই কর্মীদের বেশি অসুস্থতার ছুটি নেওয়ার প্রধান কারণ।
২০২৪ সালে জার্মানির কর্মীরা গড়ে প্রায় ২২ দিন অসুস্থতার ছুটি নিয়েছেন, যা বিশ্বের অন্যতম উচ্চ হার। স্বাস্থ্যবিমা সংস্থা বিকেকে (BKK) জানায়, ২০২২ সালে ইলেকট্রনিক অসুস্থতার সনদ বা ই-সিক নোট চালুর পর স্বল্পমেয়াদি অসুস্থতার ঘটনাও সঠিকভাবে নথিভুক্ত হওয়ায় ছুটির সংখ্যা আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে।
চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎসের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার টেলিফোনে অসুস্থতার সনদ নেওয়ার সুযোগ বাতিল করতে চায়। পাশাপাশি, নিয়োগকর্তারা চাইলে কর্মীর অনুপস্থিতির প্রথম দিন থেকেই চিকিৎসকের সনদ চাওয়ার সুযোগ পাবেন। সরকার বলছে, বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে শ্রমবাজার ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মতে, কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি বাড়ার মূল কারণ প্রশাসনিক নিয়ম নয়, বরং কঠিন কর্মপরিবেশ।
সর্বশেষ খাতভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সেবা খাতে কর্মরত নারীরা গড়ে ২৭ দিন এবং শিক্ষকরা ২৪ দিন অসুস্থতার ছুটি নিয়েছেন। অন্যদিকে আর্থিক খাতে কর্মীরা গড়ে ১৮ দিন এবং যোগাযোগ খাতের কর্মীরা ১৬ দিন ছুটি নিয়েছেন।
ডুসেলডর্ফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক জোহানেস জিগ্রিস্ট বলেন, কর্মীদের সব সময় গুরুতর বিষণ্নতায় ভুগতে হয় না। অনেকেই প্রতিকূল কর্মপরিবেশের কারণে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও চরম ক্লান্তি বা বার্নআউটের শিকার হন।
জার্মানির বৃহত্তম স্বাস্থ্যবিমা প্রতিষ্ঠান এওকে (AOK)-এর তথ্য অনুযায়ী, মোট অসুস্থতার ঘটনার মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যজনিত হলেও এ ধরনের ক্ষেত্রে একজন কর্মী গড়ে ২৮ দিন কর্মস্থল থেকে অনুপস্থিত থাকেন। ২০১৪ সালের তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে নেওয়া অসুস্থতার ছুটি ৪৭ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে শ্বাসতন্ত্রের রোগের পর এটিই কর্মস্থলে অনুপস্থিতির দ্বিতীয় বড় কারণ।
উচ্চ দায়িত্ব, কম প্রতিদান
গবেষকদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সেবা খাতের কর্মীরা একদিকে যেমন উচ্চ দায়িত্ব পালন করেন, অন্যদিকে তেমন বেতন বা সামাজিক স্বীকৃতি পান না। তাদের একই সঙ্গে কাজের চাপ, মানসিক চাপ, শারীরিক পরিশ্রম এবং অনেক ক্ষেত্রে সহিংস পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হয়।
এই পরিস্থিতিকে গবেষকরা ‘এফোর্ট-রিওয়ার্ড ইমব্যালান্স’ বা প্রচেষ্টা ও প্রতিদানের ভারসাম্যহীনতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের ভারসাম্যহীনতা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, দীর্ঘমেয়াদি কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
জার্মান স্কুল ব্যারোমিটার ২০২৪ জরিপে প্রায় অর্ধেক শিক্ষক জানিয়েছেন, তাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক বা শারীরিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিক্ষক সপ্তাহে কয়েকবার মানসিকভাবে চরম ক্লান্ত বোধ করেন।
নার্সিং খাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও বিশেষ করে হাসপাতাল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নার্সদের বেতন প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি বলে সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে।
অপব্যবহারের প্রমাণ মেলেনি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসুস্থতার ছুটির হার শুধু নিয়মের ওপর নির্ভর করে না। জনসংখ্যার গঠন, কর্মপরিবেশ, সামাজিক সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জার্মানিতে কর্মীরা অসুস্থ হলে প্রথম দিন থেকেই সর্বোচ্চ ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত পূর্ণ বেতন পান। তবে এই সুবিধা থাকা সত্ত্বেও নরওয়ে, স্লোভেনিয়া, স্পেন, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামে পূর্ণকালীন কর্মীদের অসুস্থতার ছুটির হার জার্মানির চেয়েও বেশি।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি)-এর গবেষক সোফিয়া মালিনাই ডোমাগক বলেন, অসুস্থতার ছুটির নিয়ম অনেকগুলোর মধ্যে একটি মাত্র কারণ। তাই বিভিন্ন দেশের ছুটির হার সরাসরি তুলনা করে বড় সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
এদিকে স্বাস্থ্যবিমা প্রতিষ্ঠান ডিএকে (DAK) এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইজিইএস (IGES)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালে অসুস্থতার ছুটি বাড়ার প্রধান কারণ ছিল ইলেকট্রনিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু হওয়া এবং ওই সময় শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও কোভিড-১৯ সংক্রমণের উচ্চ হার। এরপর থেকে অসুস্থতার ছুটির হার মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, মহামারির সময় চালু হওয়া টেলিফোনে অসুস্থতার সনদ ব্যবস্থার কারণে অনুপস্থিতি বেড়েছে বা কর্মীরা ব্যাপকভাবে ভুয়া অসুস্থতার অজুহাত দিয়েছেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জার্মানির ইনস্টিটিউট অব এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চের গবেষক এনজো ভেবারও বলেন, এ পর্যন্ত হওয়া বৈজ্ঞানিক গবেষণায় টেলিফোনে অসুস্থতার সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা অসুস্থতার ছুটি বাড়িয়েছে, এমন প্রমাণ মেলেনি।
সমালোচনার মুখে সরকারি পরিকল্পনা
সরকারের প্রস্তাবের সমালোচনা করেছে পরিষেবা খাতের শ্রমিক ইউনিয়ন ভারদি (Verdi)। তাদের মতে, এই উদ্যোগ কর্মীদের প্রতি সরকারের অবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।চিকিৎসক সংগঠনগুলোরও দাবি, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর আরও বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
তবে সরকার বলেছে, নতুন নিয়ম প্রয়োগ করা হবে কি না, নাকি আগের মতো অসুস্থতার চতুর্থ দিন থেকে চিকিৎসকের সনদ চাওয়ার বিধান বহাল থাকবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কোম্পানিগুলোর হাতেই থাকবে।
সূত্র: রয়টার্স