৩৪ লাখ শিশুকে দ্রুত টিকা দেওয়ার আহ্বান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার। ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশে হাম সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় আগের টিকাদান কর্মসূচির সময় টিকা না পাওয়া প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে দ্রুত টিকার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। সংস্থাটির বাংলাদেশে উপপ্রতিনিধি রাজেশ নারওয়াল বলেছেন, এসব শিশু এখনো হামের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই তাদের কাছে পৌঁছাতে আর অপেক্ষা না করে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করতে হবে।
শনিবার ঢাকায় ইনটেনসিফায়েড মিজলস-রুবেলা ক্যাচ-আপ ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ আহ্বান জানান।
রাজেশ নারওয়াল বলেন, বাংলাদেশ এপ্রিলে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি দ্রুত শুরু করে উল্লেখযোগ্য নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছে। সে সময় দেশে হাম আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছিল।
তিনি বলেন, ‘মহামারিবিদ্যাগত তথ্য, হাসপাতালের তথ্য এবং আমাদের আশপাশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পরিস্থিতি থেকে আমরা জানি, বাংলাদেশে এখনো হামের সংক্রমণ চলছে। শিশুরা এখনো হাম আক্রান্ত হচ্ছে।’
WHO-এর এই কর্মকর্তা জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি শিশুকে হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে এত বড় কর্মসূচির পরও কাজ এখনো শেষ হয়নি।
তিনি বলেন, টিকা না পাওয়া ৩৪ লাখ শিশুর কাছে আগামী ৩৬ দিনের মধ্যে পৌঁছানো একটি বড় কাজ। প্রতিদিন এক লাখেরও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। তবে কর্মসূচির শেষ দিনের জন্য অপেক্ষা না করে এখনই টিকা না পাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করার কাজ শুরু করতে হবে।
রাজেশ নারওয়াল বলেন, ‘৩৪ লাখ শিশু, ৩৬ দিন, এটি বিশাল একটি কাজ। প্রতিদিন এক লাখেরও বেশি শিশুর কাছে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু আমাদের শেষ দিনের জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। এখনই কাজ শুরু করতে হবে। যেসব শিশু টিকা পায়নি এবং এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের খুঁজে বের করে সবার কাছে পৌঁছাতে হবে।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পাশে WHO পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শুধু ক্যাচ-আপ টিকাদান কর্মসূচিতেই নয়, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা, রোগের নজরদারি বাড়ানো, প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার সক্ষমতা উন্নত করা এবং কোনো শিশুকে টিকার আওতার বাইরে না রাখার ক্ষেত্রেও WHO সহায়তা করবে।
অভিভাবক ও শিশুদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশে রাজেশ নারওয়াল বলেন, আগের টিকাদান কর্মসূচিতে কোনো কারণে কোনো শিশু টিকা থেকে বাদ পড়ে থাকলে এখনই তাকে টিকা দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আপনার সন্তান যদি কোনো কারণে আগের কর্মসূচিতে টিকা নিতে না পারে, তাহলে দয়া করে এখনই তাকে টিকা দিন।’
টিকাটি অত্যন্ত কার্যকর এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ ও সুস্বাস্থ্যের জন্য এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।
স্থানীয় সম্প্রদায় ও ধর্মীয় নেতাদেরও টিকাদান কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন WHO-এর এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘আপনাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে যেসব শিশু বাদ পড়েছে, তাদের খুঁজে বের করুন এবং নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করুন। পাশাপাশি টিকাদানকারী দলগুলোর কাজ সহজ করতে সহযোগিতা করুন।’
স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্দেশে রাজেশ নারওয়াল টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার আহ্বান জানান। বিশেষ করে টিকার সঠিক সংরক্ষণ ও পরিবহন নিশ্চিত করতে কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছাতে হবে এবং টিকা দেওয়ার পর শিশুর ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, সে বিষয়ে অভিভাবক ও শিশুদের দেখভালকারীদের যথাযথ তথ্য দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সমাজের মধ্যে খুঁজে খুঁজে সেই শেষ শিশুটির কাছেও পৌঁছানো, যে এখনো টিকার আওতার বাইরে রয়েছে।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন রাজেশ নারওয়াল। টিকাদান নিয়ে ভুল তথ্য ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘টিকা নিয়ে ভুল তথ্য ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দয়া করে সেই দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করুন।’
রাজেশ নারওয়াল বলেন, সবাই একসঙ্গে কাজ করলে এবং টিকা পাওয়ার যোগ্য প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ খুব শিগগিরই হামের সংক্রমণ বন্ধ করতে সক্ষম হবে বলে তিনি আশাবাদী।
এদিকে, ঢাকার বনানী এলাকার কড়াইলের টিঅ্যান্ডটি মাঠে দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব এএনএম বজলুর রশিদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান এবং বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি গিলিয়ান মেলসপ।
দেশে হাম সংক্রমণ অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে নতুন এই ক্যাচ-আপ কর্মসূচির মাধ্যমে আগের টিকাদান কার্যক্রমে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। WHO বলছে, ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকা দেওয়া হলেও ঝুঁকিতে থাকা বাকি শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা না গেলে সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।
সূত্রঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা