জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পেলেন অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ
মেলবোর্ন, ২৮ জুলাই: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা…
মেলবোর্ন, ২৭ জুলাই: মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছরের বেশি সময় পর দেশটির সামরিক সরকার বা জান্তা বাহিনী এখনও ক্ষমতায় থাকলেও দেশের বড় অংশ এখন বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন (ইএও) এবং ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি)-সমর্থিত পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিশেষ করে আরাকান আর্মি (এএ) রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত এখন আর শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট বা রোহিঙ্গা ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বঙ্গোপসাগরে পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে।
জান্তা সরকার দুর্বল হলেও টিকে আছে
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে সেই আন্দোলন সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয়। এনইউজি ছায়া সরকার গঠন করে এবং হাজারো মানুষ পিপলস ডিফেন্স ফোর্সে যোগ দেয়। একই সময়ে আরাকান আর্মি, কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মি (কেআইএ), চিন প্রতিরোধ গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন জাতিগত সংগঠন জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে।
২০২৩ সালের শেষ দিকে ‘অপারেশন ১০২৭’-এর মাধ্যমে ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স একাধিক সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ দখল করে। এরপর ২০২৪ ও ২০২৫ সালে জান্তা সরকার আরও কয়েকটি আঞ্চলিক কমান্ড ও বিস্তীর্ণ এলাকা হারায়।
তবে এসব ক্ষতির পরও সামরিক সরকার পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। কারণ তাদের হাতে এখনও বিমান শক্তি, গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্র এবং রাশিয়া ও চীনের মতো দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন রয়েছে।
রাখাইনে আরাকান আর্মির প্রভাব বেড়েছে
বর্তমানে আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৫টিতে কার্যত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এতে সীমান্ত পরিস্থিতি কিংবা রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের জন্য শুধু জান্তা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে কার্যকর সমাধান খোঁজা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের প্রতিরোধ আন্দোলনও একক নেতৃত্বের অধীনে নয়। ২০টিরও বেশি জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। কেউ ফেডারেল স্বায়ত্তশাসন চায়, আবার কেউ সীমান্ত বাণিজ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে দেশটিতে দ্রুত একটি ঐক্যবদ্ধ সরকার গঠনের সম্ভাবনা এখনও অনিশ্চিত।
প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়েই বাড়ছে সংঘাত
মিয়ানমারের সংঘাত শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক স্বার্থও এর বড় কারণ। জেড পাথর, বিরল খনিজ, কাঠ, প্রাকৃতিক গ্যাস, বন্দর, সীমান্ত বাণিজ্য ও বিভিন্ন অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে।
ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব সম্পদের নিয়ন্ত্রণও পরিবর্তিত হচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে জোটও বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়নি
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও তা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
মিয়ানমার রাশিয়া ও চীন থেকে অস্ত্র সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্কও বজায় রেখেছে। ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা জান্তা সরকারের কৌশলগত অবস্থান খুব বেশি পরিবর্তন করতে পারেনি।
সাবমেরিন কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার প্রযুক্তিগত সহায়তায় মিয়ানমার একটি উপকূলীয় আক্রমণাত্মক ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন নির্মাণ করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এটি উত্তর কোরিয়ার সাং-ও শ্রেণির সাবমেরিনের নকশা অনুসরণে তৈরি হচ্ছে।
প্রায় ৪০ মিটার দীর্ঘ এই সাবমেরিন অগভীর উপকূলীয় এলাকায় অভিযান চালাতে সক্ষম। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
এ কারণে বাংলাদেশের জন্য পানির নিচে নজরদারি ব্যবস্থা, সাবমেরিনবিরোধী সক্ষমতা, সামুদ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নতুন বাণিজ্য করিডরের সম্ভাবনা
চীনের নেতৃত্বে ইতোমধ্যে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (সিএমইসি) গড়ে উঠেছে। এটি ইউনান প্রদেশকে কিয়াউকফিউ বন্দরের সঙ্গে সড়ক, রেল, পাইপলাইন ও বন্দর অবকাঠামোর মাধ্যমে যুক্ত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে এই সংযোগ বাংলাদেশ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়ে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডরে (সিএমবিসি) রূপ নিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম-কিয়াউকফিউ-ম্যান্ডালে-মুসে-কুনমিং রুট ব্যবহার করে সীমিত আকারে বাণিজ্য শুরু করা এবং ধীরে ধীরে সংযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের করণীয়
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু রোহিঙ্গা সংকট হিসেবে দেখলে হবে না। এটি এখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ইস্যু।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সব পক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা, সীমান্ত ও নৌ নিরাপত্তা জোরদার করা, দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া, চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও টেকসই সমাধানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ এখন আর নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকতে পারে না। দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় মিয়ানমারের চলমান সংঘাত ও এর আঞ্চলিক প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
লেখক- মোহাম্মদ আবু সাইম
সূত্র:ইউরেশিয়া রিভিউ.কম
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au