রাতের অর্থনীতিতে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষে মেলবোর্ন
মেলবোর্ন, ২৮ জুলাই: অস্ট্রেলিয়ার দুই বড় শহর মেলবোর্ন ও সিডনিকে ঘিরে শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ক বহুদিনের। তবে এবার সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে Measuring the Night-time…
মেলবোর্ন, ২৭ জুলাই: ইউরোপে আশ্রয়ের আবেদন চূড়ান্তভাবে বাতিল হওয়া বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগে আফ্রিকার কোনো দেশ বা অন্য কোনো তৃতীয় দেশে অস্থায়ীভাবে রাখার পরিকল্পনা করছে ইউরোপের পাঁচটি দেশ। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিস যৌথভাবে এই উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরে ‘রিটার্ন হাব’ নামে বিশেষ কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্রে এমন আশ্রয়প্রার্থীদের রাখা হবে, যাদের আবেদন চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, কিন্তু বিভিন্ন কারণে যাদের তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবিত নতুন রিটার্ন রেগুলেশন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে সদস্যরাষ্ট্রগুলো ইইউর বাইরে এসব রিটার্ন হাব স্থাপন করতে পারবে। সম্ভাব্য স্বাগতিক দেশ হিসেবে কেনিয়া, উগান্ডা, ঘানা, রুয়ান্ডা, বেনিন, মৌরিতানিয়া ও উজবেকিস্তানের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।
এ উদ্যোগে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে গ্রিস। দেশটির অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মধ্যেই তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী বছর থেকেই রিটার্ন হাব চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের প্রথমে এসব হাবে রাখা হবে। পরে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। কারণ বিষয়টি এখনো নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে বাংলাদেশসহ কোনো দেশের সঙ্গে এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগ শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়। যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে, সবার ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রযোজ্য হতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও কার্যকর করা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন গ্রহণের হার খুবই কম, যদিও আবেদনকারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। বর্তমানে প্রথম ধাপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন অনুমোদনের হার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। নতুন রেগুলেশন কার্যকর হলে প্রায় ১২ সপ্তাহের মধ্যে আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। যেসব আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না, সেগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর দাবি, বর্তমানে যাদের বহিষ্কার বা প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, তাদের এক-তৃতীয়াংশেরও কমকে শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী ইউরোপেই থেকে যান এবং আশ্রয় ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেন। রিটার্ন হাব চালু হলে এ সমস্যা কমবে বলে তারা মনে করছে।
তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে শুরু থেকেই সমালোচনা রয়েছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনার পাঁচ দেশের সরকারকে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ এবং নন-রিফাউলমেন্ট নীতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপের বাইরে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপন করা হলে আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি সুরক্ষা, বিচারিক প্রতিকার এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ দুর্বল হতে পারে।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস ২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ইইউতে আশ্রয় আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল চতুর্থ বৃহত্তম উৎস দেশ। ওই বছর বাংলাদেশি নাগরিকদের ৩৬ হাজার ৯০১টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ২৪৫টি ছিল প্রথমবারের আবেদন।
একই সময়ে ৪৩ হাজার ৫২৩টি আবেদনের ওপর প্রথম ধাপের সিদ্ধান্ত দেওয়া হলেও বছরের শেষে ৪১ হাজার ৬৯২টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। একই বছরে ১ হাজার ১৭০টি আবেদন প্রত্যাহার করা হয়। প্রথম ধাপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন অনুমোদনের হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়টি অনেক আবেদনকারী তাদের আশ্রয়ের আবেদনে উল্লেখ করেছেন। যদিও ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে, তবুও বাংলাদেশ এখনো ইইউতে আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম বড় উৎস দেশ। ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট দিয়ে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশকারীদের মধ্যেও বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেছেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত বা যোগাযোগ সরকারের কাছে আসেনি।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। দেশে গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে এবং নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত আছে। তাই বিদেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার যৌক্তিকতা তিনি দেখেন না। সরকার সবসময় অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করে এবং বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
এদিকে, রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী এই উদ্যোগকে মানবাধিকারবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, প্রত্যাবাসন সহজ করার জন্য আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার অফশোর প্রসেসিং ব্যবস্থার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এ ধরনের নীতির কারণে আশ্রয়প্রার্থীদের দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা কার্যকর আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং বিচারিক প্রতিকারের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। তাই ইউরোপ যদি এমন ব্যবস্থা চালু করে, তাহলে মানবাধিকার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সূত্র: দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au