অস্ট্রেলিয়া

মূল্যস্ফীতির হার কমেছে, তবু সুদের হার নিয়ে দুশ্চিন্তায় অস্ট্রেলিয়ার লাখো ঋণগ্রহীতা

  • 7:00 pm - July 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২১ বার
দুশ্চিন্তায় অস্ট্রেলিয়ার গৃহঋণগ্রহীতারা

মেলবোর্ন, ২৯ জুলাই: অস্ট্রেলিয়ায় মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশার তুলনায় কমে এলেও দেশটির লাখো গৃহঋণগ্রহীতার উদ্বেগ এখনো কাটেনি। আগামী ১১ আগস্ট সুদের হার নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে যাচ্ছে রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া (আরবিএ)। সেই সিদ্ধান্তের আগে প্রকাশিত সর্বশেষ মূল্যস্ফীতির তথ্য নতুন করে অর্থনীতি ও সুদের হার নিয়ে জোর আলোচনা তৈরি করেছে।

অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (এবিএস) বুধবার প্রকাশিত জুন প্রান্তিকের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ৩০ জুন পর্যন্ত ১২ মাসে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ৪ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে।

সর্বশেষ এই তথ্য প্রকাশের পর অস্ট্রেলিয়ার চারটি বৃহৎ ব্যাংকের মধ্যে সর্বশেষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওয়েস্টপ্যাক পূর্বাভাস দিয়েছে, আগস্টে আরবিএ সম্ভবত সুদের হার অপরিবর্তিত রাখবে।

ওয়েস্টপ্যাকের প্রধান অর্থনীতিবিদ লুসি এলিস, যিনি প্রায় তিন দশক রিজার্ভ ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করেছেন, বলেন, “এ বছর আর আরবিএ সুদের হার বাড়াবে বলে আমরা মনে করি না। মূল্যস্ফীতি আমাদের এবং আরবিএর পূর্বাভাসের তুলনায় অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত রয়েছে।”

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের শুরুতে জ্বালানির দাম বাড়লেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই চাপ আর আগের মতো অব্যাহত নেই।

তার ভাষায়, “এটি ইতিবাচক। তৃতীয় প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়লে নভেম্বরে সুদের হার বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকতে পারে, তবে সেটি আমাদের মূল পূর্বাভাস নয়।”

তবে মূল্যস্ফীতির হার এখনো আরবিএর ২ থেকে ৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে।

কেপিএমজির প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্রেন্ডন রিন বলেন, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও মূল বা ট্রিমড মিন ইনফ্লেশন এখনো উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। তার মতে, আগস্টে বর্তমান ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ নগদ সুদের হার আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, “আরবিএ এখন কঠিন অবস্থায় রয়েছে। অর্থনীতি খুব শক্তিশালী নয়, আবার বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তাও রয়েছে। তবুও মূল্যস্ফীতিকে লক্ষ্যমাত্রায় ফেরাতে প্রয়োজনে আরও সুদের হার বাড়ানো হতে পারে।”

মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের আগে আগস্টে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা বাজারে ২১ শতাংশ ধরা হলেও তথ্য প্রকাশের পর তা কমে ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

Australian households still face inflationary pressures, and potential rate hikes, despite a surprise drop in June.

ভ্যানএক-এর বিনিয়োগ ও মূলধন বাজার বিভাগের প্রধান রাসেল চেসলার বলেন, বাজার হয়তো অতিরিক্ত আশাবাদী হয়ে পড়েছে।

তার ভাষায়, “আজকের মূল্যস্ফীতির তথ্যকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা উচিত নয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মূল মূল্যস্ফীতি এখনো কমেনি। মূল্যস্ফীতি গভীরভাবে স্থায়ী হয়ে গেছে এবং ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ তা আরবিএর লক্ষ্যমাত্রায় ফিরবে বলে আশা করা কঠিন।”

মূল্যস্ফীতি কমায় সতর্ক আশাবাদ

অস্ট্রেলিয়ার কোষাধ্যক্ষ জিম চ্যালমার্স মূল্যস্ফীতির সর্বশেষ তথ্যকে উৎসাহব্যঞ্জক বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে এখনো অনেক পথ বাকি।

তিনি বলেন, “একটি তথ্য প্রকাশের ওপর ভিত্তি করে আমরা অতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত হতে চাই না। তবে বাজার, ট্রেজারি এবং রিজার্ভ ব্যাংকের প্রত্যাশার তুলনায় মূল্যস্ফীতি কম আসা অবশ্যই ইতিবাচক।”

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত এখনো অস্ট্রেলিয়ার মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতভেদ

গ্লোবাল এক্স-এর জ্যেষ্ঠ বিনিয়োগ কৌশলবিদ মার্ক জোকাম মনে করেন, সর্বশেষ তথ্য অস্ট্রেলিয়ার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে এবং এটি আরবিএকে আপাতত সুদের হার না বাড়ানোর সুযোগ দেবে।

তবে আরবিএ গভর্নর মিশেল বুলক মঙ্গলবারই স্পষ্ট করে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও সুদের হার বাড়াতে প্রস্তুত।

তিনি বলেন, “বোর্ড তার দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে। প্রয়োজন হলে নগদ সুদের হার আরও বাড়ানো হবে।”

অন্যদিকে অক্সফোর্ড ইকোনমিকস অস্ট্রেলিয়ার অর্থনৈতিক গবেষণা বিভাগের প্রধান হ্যারি মারফি ক্রুজ বলেন, সর্বশেষ তথ্য আরবিএর ওপর চাপ কিছুটা কমাবে এবং তার মতে আগামী মাসে সুদের হার অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

তিনি বলেন, “মূল মূল্যস্ফীতি শুধু স্থিতিশীল নয়, প্রান্তিকভিত্তিক হিসাবেও কমছে। তবে এটিকে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে বলে ধরা যাবে না।”

ডেলয়েট অ্যাকসেস ইকোনমিকস-এর অংশীদার স্টিফেন স্মিথও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, আগস্টে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা কমেছে, তবে ২০২৬ সালের মধ্যেই আবারও সুদের হার বাড়তে পারে।

মূল্যস্ফীতির বিস্তারিত চিত্র

যদিও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমেছে, আরবিএর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক ট্রিমড মিন ইনফ্লেশন গত বছরের মতোই ৩ দশমিক ৬ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে।

ট্রিমড মিন ইনফ্লেশন এমন একটি সূচক, যেখানে সবচেয়ে বেশি এবং সবচেয়ে কম মূল্য পরিবর্তনের ১৫ শতাংশ বাদ দিয়ে হিসাব করা হয়। ফলে জ্বালানির মতো অস্থির পণ্যের প্রভাব কমে যায়।

বাজারের পূর্বাভাস ছিল এই হার ৩ দশমিক ৭ থেকে ৩ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে থাকবে।

জুন পর্যন্ত বছরে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় অবদান এসেছে আবাসন ব্যয় থেকে, যা ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া অ্যালকোহলবিহীন পানীয় এবং বিনোদন ও সংস্কৃতি খাতে মূল্য বেড়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ করে।

এবিএসের মূল্য পরিসংখ্যান বিভাগের প্রধান র্যাচেল ম্যাকক্রিরিক বলেন, “বড় মূল্য পরিবর্তনগুলো বাদ দিলে মূল মূল্যস্ফীতি ১২ মাসে ৩ দশমিক ৬ শতাংশেই স্থির রয়েছে, যা মে মাসের সমান।”

তিনি জানান, বিদ্যুতের মূল্য এখনো মূল্যস্ফীতির অন্যতম বড় চালিকা শক্তি। এক বছরে বিদ্যুতের দাম ২২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।

তার মতে, “গৃহস্থালি বিদ্যুৎ বিল কমাতে সরকারের দেওয়া ভর্তুকি শেষ হয়ে যাওয়ায় এই বৃদ্ধি ঘটেছে।”

গৃহঋণগ্রহীতাদের জন্য এর অর্থ কী

আগস্টের ১১ তারিখে সুদের হার নির্ধারণের আগে এটিই আরবিএর হাতে থাকা সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্য।

মার্ক জোকাম বলেন, “আজকের তথ্য দেখাচ্ছে মূল্যস্ফীতির আগুন ধীরে ধীরে নিভতে শুরু করেছে। এতে কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো আরবিএ কিছুটা স্বস্তি পেল।”

তিনি বলেন, “মূল মূল্যস্ফীতি এখনো আরবিএর ২ থেকে ৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকলেও এটি মে মাসে প্রকাশিত আরবিএর নিজস্ব পূর্বাভাসের নিচে এসেছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য অপেক্ষা করতে পারে।”

তার মতে, “আগস্টে সুদের হার বাড়ানোর চাপ এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।”

তিনি বলেন, “গত সপ্তাহে শ্রমবাজারের শক্তিশালী তথ্য আরবিএকে সতর্ক থাকার কারণ দিয়েছিল। আজকের মূল্যস্ফীতির তথ্য আবার সুদের হার স্থির রাখার পক্ষে যুক্তি তৈরি করেছে।”

হ্যারি মারফি ক্রুজ বলেন, জুনে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কমেছে, যা আরবিএর ওপর চাপ কমিয়েছে।

তিনি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের দাম বাড়লে খাদ্য, ভ্রমণ, উৎপাদন ও পরিবহনসহ প্রায় সব খাতেই ব্যয় বাড়ে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সেই অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়, তাহলে সাময়িক জ্বালানি সংকট দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতিতে রূপ নিতে পারে। তবে আজকের তথ্য সেই আশঙ্কা কিছুটা কমিয়েছে।”

বেন্ডিগো ব্যাংক-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড রবার্টসন বলেন, মূল্যস্ফীতিতে অগ্রগতি হলেও এর অর্থ এই নয় যে সুদের হার দ্রুত কমে যাবে।

তিনি বলেন, “বাজার আগামী বছর সুদের হার কমার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে এবং কেউ কেউ একাধিক দফা হার কমানোর পূর্বাভাসও দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের ধারণা, পুরো নতুন অর্থবছরজুড়েই মূল মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থানে থাকবে। ফলে ২০২৬ সালের নভেম্বর কিংবা ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরেক দফা সুদের হার বৃদ্ধির ঝুঁকি এখনো রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “সুদের হার কমানোর বিষয়ে ভাবার আগে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে কমছে, এমন আরও অনেক প্রমাণ দেখতে চাইবে রিজার্ভ ব্যাংক।”

এই শাখার আরও খবর

গুলশান থেকে গ্রেপ্তার সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী

মেলবোর্ন, ৩০ জুলাই: শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি)…

পুলিশের বাধায় হবিগঞ্জ যেতে পারেননি এনসিপি নেতারা

মেলবোর্ন, ৩০ জুলাই:হবিগঞ্জে পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার পথে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহর। পরে হবিগঞ্জ সীমান্তেও…

ইরানকে ফের কঠোর হামলার হুমকি ট্রাম্পের

মেলবোর্ন, ৩০ জুলাই: মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর তেহরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের…

২০৩৬ সালে টাকার মূল্য থাকবে না? এআই নিয়ে ইলন মাস্কের বিস্ময়কর ভবিষ্যদ্বাণী

মেলবোর্ন, ২৯ জুলাই: বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক দাবি করেছেন, আগামী এক দশকের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবটের অগ্রগতির ফলে প্রচলিত অর্থব্যবস্থার…

‘দ্য ওডিসি’তে কে কত পারিশ্রমিক নিয়েছেন

মেলবোর্ন, ৩০ জুলাই: পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য ওডিসি’ বিশ্বজুড়ে বক্স অফিসে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। গ্রিক মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটি মুক্তির পর…

আত্মহত্যার আগের দিন থানায় গিয়েছিলেন মা, সমুদ্রে মিলল মা-মেয়ের মরদেহ

মেলবোর্ন, ৩০ জুলাই: অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যার সন্দেহে থাকা এক মা ঘটনার আগের দিনই স্থানীয় থানায় গিয়েছিলেন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au