বিশ্ব

ট্রাইব্যুনালে ন্যায্য বিচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান

  • 9:43 pm - July 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৪৭ বার
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর, বাংলাদেশের ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা। ছবি: ২০২৫ © মামুনুর রশীদ/নুরফটো, এপি ফটোর মাধ্যমে।

মেলবোর্ন, ২৯ জুলাই: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) বিচার কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক মানের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে না বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলেছে, বিচার প্রক্রিয়ায় যথাযথ আইনি পদ্ধতি অনুসরণ না করলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। একই সঙ্গে আইনের শাসন দুর্বল হওয়া, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকার করার সুযোগ তৈরি হওয়া এবং অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও রয়েছে।

মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, গত ২৭ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং দুইজন সাংবাদিকও রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত বিভিন্ন গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে যারা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। তবে অনেক মামলায় আন্তর্জাতিক মানের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় জরুরি সংস্কার প্রয়োজন এবং দুর্বল তদন্ত বা ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

সংস্থাটি জানায়, বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের ঘটনাগুলোর বিচার চলছে। ওই ঘটনায় ৮০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত হন। এছাড়া শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনাও বিচারাধীন রয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ট্রাইব্যুনালের একাধিক মামলায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের ভাষা ও অভিযোগ বিভিন্ন সাক্ষীর জবানবন্দিতে প্রায় হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যা সাক্ষ্যগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনাল ছয়টি মামলার বিচার শেষ করেছে। এসব মামলায় ৬২ জন মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ৪২ জনের বিচার হয়েছে অনুপস্থিতিতে এবং ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১০ সালে গঠন করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার জন্য। তবে সেই সময়ের বিচারও প্রমাণের দুর্বলতা, রাজনৈতিক পক্ষপাত, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের মধ্যে যোগসাজশ এবং ন্যায্য বিচার নিশ্চিত না করার অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।

২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করলেও তা আন্তর্জাতিক মানের বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির অভিযোগ, বর্তমান আইন অনুযায়ী পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই কাউকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া যায়। গ্রেপ্তারের লিখিত কারণ না জানিয়ে দীর্ঘদিন আটক রাখার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বিচার শুরুর আগে আসামিপক্ষকে প্রস্তুতির জন্য খুব কম সময় দেওয়া হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও সীমিত থাকে।

সংস্থাটি বিশেষভাবে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আনা মামলার বিষয়টিও উল্লেখ করেছে। গত ১৪ মে ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ নিয়ে সংবাদ প্রচারের অভিযোগে একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু ও উপস্থাপক ফারজানা রূপাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। পরে ২৭ জুলাই তাদেরও ৪১ জনের অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, সাংবাদিকদের আইনজীবীদের দাবি অনুযায়ী, তাদের গ্রেপ্তারের লিখিত কারণ জানানো হয়নি, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।

বিবৃতিতে চট্টগ্রামের একটি মামলার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ২২ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে ব্যবহৃত ৫৫টি সাক্ষ্যবিবৃতির মধ্যে একাধিক অনুচ্ছেদ প্রায় একই ভাষায় বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের মিল সাক্ষ্যগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

এছাড়া ওই মামলায় আটক আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবীরা একটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেন। সেখানে দাবি করা হয়, এক ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউটর এক কোটি টাকার বিনিময়ে জামিনের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অভিযোগ প্রকাশের পর ওই প্রসিকিউটর পদত্যাগ করলেও বিষয়টির তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এর মধ্যেই মামলাটির অভিযোগ গঠন সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী ৬ আগস্ট বিচার শুরুর কথা রয়েছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচার ব্যবস্থার অপব্যবহার হয়েছে। সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয়। একই ধরনের সাক্ষ্যবিবৃতির ভিত্তিতে মামলা পরিচালনা একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে এবং এতে ভুক্তভোগী, তাদের পরিবার ও দেশের জনগণ প্রকৃত ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

-হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

এই শাখার আরও খবর

চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও গুড়িয়ে দিল বিএনপির নেতাকর্মীরা

চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর জেরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকার নিউগ্রিনি…

৩৪ লাখ শিশুকে দ্রুত টিকা দেওয়ার আহ্বান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

বাংলাদেশে হাম সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় আগের টিকাদান কর্মসূচির সময় টিকা না পাওয়া প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে দ্রুত টিকার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা…

পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চুক্তি

শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার এবং বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তিতে সহযোগিতা আরও গভীর করতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই…

বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের অবস্থান শক্ত হচ্ছে, তারেক রহমান আগুন নিয়ে খেলছেন: সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার

বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের  সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশ…

টানা তিন শিরোপার পর কোচিং ছাড়ার ভাবনা ফাগানের

অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল লিগ (এএফএল) ক্লাব ব্রিসবেন লায়ন্সকে টানা তৃতীয়বার প্রিমিয়ারশিপ জেতানোর পর ২০২৭ সালে কোচ হিসেবে থাকবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন ক্রিস ফাগান।…

পাকিস্তানে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে বোমা হামলা, নিহত ১১

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে পুলিশের একটি তল্লাশি চৌকিতে বোমা হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২০ জন। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর)…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au