গুলশান থেকে গ্রেপ্তার সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী
মেলবোর্ন, ৩০ জুলাই: শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি)…
মেলবোর্ন, ২৯ জুলাই: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) বিচার কার্যক্রমে ন্যায্য বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলেছে, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ত্রুটি ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনকে দুর্বল করতে পারে।
বুধবার লন্ডন থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ বলেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে সংস্থাটির মতে, অনেক মামলায় আন্তর্জাতিক মানের ন্যায্য বিচারের নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে না।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। নতুন সরকারের উচিত দুর্বল তদন্ত ও ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোনো সুযোগ না রাখা।”
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের ঘটনাগুলোর বিচার চলছে। ওই ঘটনায় ৮০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হন। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।
এইচআরডব্লিউ জানায়, তারা ট্রাইব্যুনালের এক ডজনেরও বেশি মামলা পর্যবেক্ষণ করে বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি দেখতে পেয়েছে। সংস্থাটির দাবি, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা ছাড়াই ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া একাধিক মামলায় এমন সাক্ষ্যবিবৃতি ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে একই ধরনের ভাষা ও অনুচ্ছেদ হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এতে এসব সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংস্থাটি জানায়, গত ২৭ জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং দুইজন সাংবাদিক রয়েছেন।
এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ট্রাইব্যুনাল ছয়টি মামলার বিচার সম্পন্ন করেছে। এতে ৬২ জন মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ৪২ জনের বিচার হয়েছে অনুপস্থিতিতে এবং ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০১০ সালে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার করতে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অতীতেও রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অভাবের অভিযোগে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে কিছু অপরাধের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হলেও, এইচআরডব্লিউর মতে বর্তমান আইন এখনো আন্তর্জাতিক মানের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
সংস্থাটি বলেছে, বর্তমান আইনে পর্যাপ্ত প্রমাণের মানদণ্ড পূরণ না করেই প্রসিকিউটর গ্রেপ্তারের আবেদন করতে পারেন। লিখিত কারণ ছাড়াই কোনো ব্যক্তিকে মাসের পর মাস আটক রাখা যায় এবং অন্য আদালতে অন্তর্বর্তী আপিলের সুযোগও নেই।
এছাড়া আসামিপক্ষকে মামলার প্রস্তুতির জন্য খুব কম সময় দেওয়া হয়, পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা ছাড়াই অনুপস্থিতিতে বিচার চালিয়ে যাওয়া হয় এবং প্রতিরক্ষা আইনজীবীদের সাক্ষী জেরা করার ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ নিয়ে সংবাদ প্রচারের অভিযোগে গত ১৪ মে সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এইচআরডব্লিউ জানায়, সাংবাদিকদের আইনজীবীদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রসিকিউশন তাদের গ্রেপ্তারের লিখিত কারণ জানায়নি, যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির পরিপন্থী।
এছাড়া ২৭ জুলাই দাখিল করা অভিযোগপত্রে ওই দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। তাদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যের প্রমাণ থাকতে হয়।
চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের একটি মামলার কথাও উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ। ওই মামলায় ২২ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সমর্থনে ব্যবহৃত একাধিক সাক্ষ্যবিবৃতিতে একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও নির্দেশনার অভিযোগ আনা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এতে প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এছাড়া এক অভিযুক্তকে এক কোটি টাকার বিনিময়ে জামিন পাইয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে এক ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ। অডিও রেকর্ড প্রকাশের পর ওই প্রসিকিউটর পদত্যাগ করলেও প্রধান প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এর মধ্যেই আগামী ৬ আগস্ট মামলার বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
বিবৃতির শেষে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, গুরুতর অপরাধের বিচার অবশ্যই ন্যায্য, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে এবং তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।
-এইচআরডব্লিউ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au