কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সোনালী ব্যাংক ঋণসীমা প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়ে উল্লেখ করে, বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার কারণে ভালো গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থায়ন করা সম্ভব হচ্ছিল না। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছিল। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণসীমা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
যেসব শাখার ওপর থেকে এই সীমা তুলে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয় শাখা, ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখা, শিল্প ভবন করপোরেট শাখা, শহীদ আবরার ফাহাদ এভিনিউ করপোরেট শাখা এবং চট্টগ্রামের লালদীঘি করপোরেট শাখা। আগে শাখাভেদে সর্বোচ্চ ৫ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণের সীমা ছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এসব শাখায় ঋণ বিতরণে আর কোনো নির্ধারিত অঙ্কের সীমাবদ্ধতা থাকছে না।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০০৭ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচির আওতায় সোনালী ব্যাংকের বড় শাখাগুলোতে ঋণ বিতরণে সীমা আরোপ করা হয়েছিল। পরে ২০১২ সালের হলমার্ক কেলেঙ্কারির পর ব্যাংকটির ওপর নজরদারি আরও কঠোর করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্টদের মতে, সেই পদক্ষেপ ব্যাংকটির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক শৃঙ্খলা উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটি সীমা তুলে নেওয়ার আবেদন করলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাতে সম্মতি দেয়। একই সঙ্গে নতুন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করতে এবং অতীতে বিতর্কিত বা অভিযুক্ত গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আলী খান বলেন, পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার ওপর ঋণসীমা থাকায় অনেক ভালো গ্রাহক প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছিলেন না। বাংলাদেশ ব্যাংক সীমা তুলে নেওয়ায় এখন নিয়ম অনুযায়ী যোগ্য গ্রাহকদের অর্থায়ন করা সহজ হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৪ জুন স্থানীয় কার্যালয় শাখার ঋণসীমা ৫ কোটি টাকা থেকে ২০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছিল। পরে ১৪ জুলাই পাঠানো এক চিঠিতে সোনালী ব্যাংক সব ধরনের সীমা পুরোপুরি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায়। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই সর্বশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সীমা প্রত্যাহারের আগেই স্থানীয় কার্যালয় শাখার গ্রাহক আরহাম মাল্টি ট্রেডিংয়ের জন্য ৪০ কোটি টাকা এবং মুন্নু গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মুন্নু ফেব্রিকসের জন্য ৫০ কোটি টাকা ঋণ নীতিগত ভাবে অনুমোদন করেছিল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। আগে এসব ঋণ বিতরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনাপত্তি প্রয়োজন হতো। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষেত্রে আলাদা অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না।
বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংককে তুলনামূলক ভাবে সবচেয়ে স্থিতিশীল অবস্থানে বিবেচনা করা হচ্ছে। ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তাদের নিট মুনাফা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ৯৮৮ কোটি টাকা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বর্তমানে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা এবং ঋণের স্থিতি ১ লাখ ৪ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। যদিও দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশের বেশি, সোনালী ব্যাংকে এ হার প্রায় ১৮ শতাংশ। হলমার্ক, বেক্সিমকো, থারমেক্স ও ওরিয়ন গ্রুপসহ কয়েকটি বড় গ্রাহকের খেলাপি ঋণের কারণে এই হার এখনো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে।