যানজটে আটকে সড়কে জন্ম নেওয়া সেই নবজাতক মারা গেছে
মেলবোর্ন, ৫ আগষ্ট: সাভারের ভয়াবহ যানজটের কারণে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে সড়কেই জন্ম নেওয়া সেই নবজাতক শেষ পর্যন্ত বাঁচানো গেল না। জন্মের দুই দিন পর…
মেলবোর্ন, ৫ আগস্ট ২০২৬: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার আজ দুই বছর পূর্ণ হলো। যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে, পরবর্তী সময়ে তা আর কেবল কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সরকার পতনের একটি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। পরবর্তীকালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিভিন্ন বক্তব্য ও ঘটনাপ্রবাহের আলোকে অনেকেই মনে করেন, এর নেপথ্যে গভীর রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা ছিল।
পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল দেশকে আইনের শাসন, গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে দেশে যে ভয়াবহ অব্যবস্থা, অনিশ্চয়তা ও দুঃশাসনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, তার মূল্যায়ন ইতিহাসই করবে।
বাংলাদেশের বহু মানুষ আশা করেছিলেন, শেখ হাসিনা-পরবর্তী সরকারে রাজনৈতিক মত প্রকাশের কারণে কাউকে নির্যাতনের শিকার হতে হবে না; অস্বস্তিকর সত্য প্রকাশের দায়ে কোনো সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া হবে না; এবং কোনো ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে নিজের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা উপাসনালয় রক্ষার জন্য অসহায়ভাবে অপেক্ষা করতে হবে না। কিন্তু দুই বছর পর বাস্তবতা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—আজ সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়টি বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
তাদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মন্দির, জমি এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বারবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। ধর্ম অবমাননা কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ অনেক ক্ষেত্রে মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক দুটি মানবাধিকার প্রতিবেদন পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ—এইচআরসিবিএম জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩ জেলায় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর ৮২৪টি নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
সংগঠনটির হিসাবে এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে ১৬৮টি হত্যা ও রহস্যজনক মৃত্যু, ২২৩টি অপহরণ ও শারীরিক হামলা, ৪১টি যৌন সহিংসতা, ১৪১টি মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা কিংবা ভাঙচুর, ২৩৪টি সম্পত্তিতে হামলা, ভূমি দখল, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট এবং ১৭টি ধর্ম অবমাননাসংক্রান্ত ঘটনা।
এইচআরসিবিএম যথাযথভাবেই সতর্ক করেছে যে, সংখ্যালঘু কোনো ব্যক্তি অপরাধের শিকার হলেই প্রতিটি ঘটনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধর্মীয় কিংবা জাতিগত বিদ্বেষের ফল হিসেবে ঘোষণা করা যায় না। প্রতিটি ঘটনার উদ্দেশ্য আলাদাভাবে তদন্ত করতে হবে।
সংগঠনটি বলেছে, হামলার ভৌগোলিক বিস্তৃতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যপূর্ণ আচরণের অভিযোগ গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় ২৬১ জন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের হিসাবে ওই সময়ে ৪০টি ঘটনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৪৪ জন নিহত হয়েছেন।
ঐক্য পরিষদ আরও দাবি করেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ২৩ মাসে তারা মোট ২ হাজার ৯৬৩টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।
সংগঠনটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব ঘটনার প্রায় ৭৩ দশমিক ৭ শতাংশ ঘটেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী প্রথম পাঁচ মাসে। তারা ওই সময়কে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণসহিংসতার সময় হিসেবে বর্ণনা করেছে।
একাধিক সংগঠন যখন হত্যা, উপাসনালয়ে হামলা, সম্পত্তি দখল, যৌন সহিংসতা, ভয়ভীতি এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নির্যাতনের ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরে, তখন দায়িত্বশীল কোনো সরকার অস্বীকারের নীতি গ্রহণ করতে পারে না। অস্বীকার কোনো রাষ্ট্রীয় নীতি হতে পারে না।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে মব-সহিংসতা ক্রমেই স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য আচরণে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক কার্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, ব্যক্তিগত বাড়িঘর এবং গণমাধ্যম—সবকিছুই কখনো না কখনো সংঘবদ্ধ ভয়ভীতি ও হামলার শিকার হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশের মব-সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং সাংবাদিক হয়রানির ঘটনাকে উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে সংস্থাটি জানিয়েছে, শুধু ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মব-হামলায় অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও জানিয়েছে, ২০২৫ সালে মতপ্রকাশ, সংগঠন ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা অপ্রয়োজনীয়ভাবে সীমিত ছিল। সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, লেখক, ব্লগার এবং সাধারণ নাগরিকরা মত প্রকাশের কারণে গ্রেপ্তার, হুমকি, হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সংস্থাটি আরও বলেছে, বছরের একটি বড় সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে ভূমিকা রেখেছে।
মব-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে বিবৃতি দিলেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না। যারা হামলা চালায় তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। যারা হামলা সংগঠিত করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
গণমাধ্যম কি জনগণের স্বার্থে কাজ করবে, নাকি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে চলবে?
রয়টার্স জানিয়েছে, শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের তথ্য উপদেষ্টা দেশের গণমাধ্যমকে সতর্ক করে বলেছেন, শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার, প্রকাশ কিংবা সম্প্রচার করা হলে তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের আদেশ লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।
ওই আদেশে শেখ হাসিনার ভাষণ, বিবৃতি, সাক্ষাৎকার এবং অডিও-ভিডিও বার্তা প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।
ভারত জানিয়েছে, অনুষ্ঠানটি ব্যক্তিগতভাবে আয়োজিত এবং ভারত সরকার এর সঙ্গে জড়িত নয়। সেখানে প্রকাশিত মতামতকেও ভারত সরকারের সমর্থন হিসেবে দেখা যাবে না।
২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি এই রায়কে আইনগতভাবে অকার্যকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
একই সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ট্রাইব্যুনালের একাধিক মামলায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের ভাষা ও অভিযোগ বিভিন্ন সাক্ষীর জবানবন্দিতে প্রায় হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যা সাক্ষ্যগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
কোনো সংবাদমাধ্যম মনে করতে পারে, শেখ হাসিনার বক্তব্যের কোনো সংবাদমূল্য নেই। তারা বক্তব্যের শুধু নির্দিষ্ট অংশ প্রকাশ করতে পারে। সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করতে পারে। ভুল তথ্য শনাক্ত করতে পারে। বক্তব্যের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ইতিহাস ও পাল্টা তথ্য যুক্ত করতে পারে। এসব সম্পূর্ণভাবে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত।
কিন্তু রাষ্ট্র যদি দেশের সব গণমাধ্যমকে নির্দেশ দেয় যে একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তির বক্তব্য প্রকাশ করা যাবে না, তাহলে সেটি সম্পাদকীয় নীতি নয়। সেটি রাষ্ট্রীয়ভাবে আরোপিত পূর্বনিয়ন্ত্রণ বা ‘প্রায়র রেস্ট্রেইন্ট’।
শেখ হাসিনার বক্তব্য সত্য, গ্রহণযোগ্য কিংবা নির্দোষ—এ কারণে নয়; বরং জনগণের নিজে শুনে, বিচার করে এবং প্রয়োজনে প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রয়েছে বলেই তাঁর বক্তব্য সংবাদ হতে পারে।
কিছুদিন আগে রয়টার্সকে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি এবং তাঁর দলের অন্য নেতারা ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
এই ঘোষণার কাছাকাছি সময়ে গণমাধ্যমের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সরকার কি তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন? সরকারের নিজস্ব আচরণই এমন সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
সরকার রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব দিবে তথ্য, প্রমাণ ও যুক্তি দিয়ে।
২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ আশা করেছিল, দেশে তাঁদের ওপর নির্যাতন, হামলা, হুমকি, মিথ্যা মামলা ও চাঁদাবাজির ঘটনা কমবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন এখনো স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি। বরং বিভিন্ন ঘটনায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে এখনো নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের জন্য আকুতি জানাতে হচ্ছে।
তাঁদের আরও প্রত্যাশা ছিল, চিন্ময় কৃষ্ণ ব্রহ্মচারীর মামলাটি ন্যায়সংগত ও স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু তিনি এখনো কারাগারে রয়েছেন, যা নিয়ে তাঁর সমর্থক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাঁদের অভিযোগ, তাঁকে অন্যায়ভাবে আটক রাখা হয়েছে এবং তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
একই সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য দেবতা শ্রীরামের প্রতিকৃতিকে প্রকাশ্যে জুতাপেটা করার ঘটনার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রশ্ন—হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাস্যকে প্রকাশ্যে অপমান করা হলে সেটি কি ধর্ম অবমাননা হিসেবে বিবেচিত হয় না? যারা এই কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কি ধরে নিতে হবে, একই দেশে ধর্ম ও পরিচয়ভেদে ভিন্ন আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে?
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত এবং কয়েকশ মানুষ আহত হন। ওই মামলায় ২০১৮ সালে বিচারিক আদালত তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট তাঁকে এবং মামলার অন্য আসামিদের খালাস দেন। আদালত বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া আইনসম্মতভাবে পরিচালিত হয়নি এবং উপস্থাপিত প্রমাণ দণ্ড নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আপিল বিভাগও সেই খালাসের রায় বহাল রাখেন। তাঁর সাজা বাতিল হয়েছে এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালত সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। কিন্তু খালাসের রায় জনগণের প্রশ্ন করার অধিকার কেড়ে নেয় না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হামলার মামলায় প্রথমে ব্যাপক সাজা এবং পরে সব আসামির খালাস—এই নাটকীয় পরিবর্তন কীভাবে ঘটল? বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা কি আদৌ স্বাধীন? এই প্রশ্নগুলোর স্বচ্ছ উত্তর পাওয়ার অধিকার নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তি এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্ত আইনগত বিশ্লেষণ, গণতান্ত্রিক আলোচনা এবং ঐতিহাসিক পর্যালোচনার জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।
বাংলাদেশ আজ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সত্যনিষ্ঠ গণমাধ্যমের প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। শেখ হাসিনা সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে; তাঁর শাসনামল নিয়ে কঠোর, তথ্যভিত্তিক ও যুক্তিনির্ভর আলোচনা হওয়াও জরুরি। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ন্যারেটিভ তৈরি করে সত্য আড়াল করা কিংবা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
গণমাধ্যমের কাজ কোনো সরকার, দল বা গোষ্ঠীর বয়ান প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং জনগণের সামনে যাচাই করা তথ্য তুলে ধরা। তাই সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ, নির্দিষ্ট বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা বা ভিন্নমত দমনের চেষ্টা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না—বরং দুর্বল করে।
কোনো বক্তব্য নিষিদ্ধ করলেই রাজনৈতিক বিরোধ বা সামাজিক অস্থিরতা শেষ হয়ে যায় না। বরং এর ফলে অবিশ্বাস, গুজব, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও চরমপন্থা আরও অন্ধকার ও অনিয়ন্ত্রিত পরিসরে আশ্রয় নেয়। সত্যকে মোকাবিলা করতে হয় আরও বেশি সত্য, প্রমাণ ও উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে—নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়।
৫ আগস্টের দুই বছর পর বাংলাদেশকে আজ গভীরভাবে আত্মসমালোচনা করতে হবে—সেই অভ্যুত্থান আসলে কীসের প্রতীক ছিল?
এটি কি সত্যিই জনগণের মুক্তি, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের আন্দোলন ছিল?
নাকি একটি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে অন্য একটি অগণতান্ত্রিক শক্তির হাতে তুলে দেওয়ার পথ তৈরি হয়েছিল? নাকি এর আড়ালে দেশকে ক্রমে আরও মৌলবাদী, ধর্মভিত্তিক ও অসহিষ্ণু রাষ্ট্রে পরিণত করার কোনো গভীর রাজনৈতিক প্রকল্প কাজ করছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ইতিহাস একদিন অবশ্যই দেবে। কিন্তু তার আগে স্বাধীন গণমাধ্যমকে সত্য অনুসন্ধান ও প্রকাশের অধিকার দিতে হবে।
সম্পাদক: ড. প্রদীপ রায়, মেলবোর্ন
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au