মিরপুরে প্রাইভেট কার থেকে বিএনপি নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি, আহত ২
মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট- ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বরে প্রাইভেট কার থেকে নেমে এক বিএনপি নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বিএনপি নেতা ও মাছের…
মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট- পর্দায় তাঁকে দেখলেই দর্শকের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। কখনো মুখভঙ্গি, কখনো সংলাপ বলার ধরন, আবার কখনো বিপদে পড়ে তাঁর অসহায় উপস্থিতিই হয়ে ওঠে হাসির কারণ। বলিউডে প্রায় তিন দশকের ক্যারিয়ারে রাজপাল যাদব এমনই এক পরিচিত মুখ।
কিন্তু পর্দার এই হাসির মানুষের ব্যক্তিজীবন মোটেও হাসিতে ভরা নয়। মাত্র ২০ বছর বয়সে স্ত্রীকে হারিয়েছেন। অভিনয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে ছোট শহর থেকে পাড়ি দিয়েছেন দিল্লি, পরে মুম্বাইয়ে। ক্যারিয়ারে সাফল্য এলেও নিজের প্রযোজনায় সিনেমা বানানোর সিদ্ধান্ত তাঁকে জড়িয়ে ফেলে বড় অঙ্কের ঋণের জালে।
সেই ঋণ থেকে চেক বাউন্সের মামলা, আদালত, কারাবাস। ২০১৮ সালে জেল খাটার পর চলতি বছর আবার তিহারে যেতে হয়েছে তাঁকে। এবার সেই আর্থিক সংকটের জেরেই সামনে এসেছে আরও বড় বিপদ। উত্তর প্রদেশের শাহজাহানপুরে তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি নিলামে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।
অর্থাৎ, যে সিনেমা ছিল তাঁর স্বপ্ন, সেটিই গত ১৬ বছর ধরে হয়ে আছে জীবনের অন্যতম বড় দুঃস্বপ্ন।
ছোট শহর থেকে বলিউড
১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ উত্তর প্রদেশের শাহজাহানপুরের কুন্দ্রা গ্রামে জন্ম রাজপাল যাদবের। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তাঁকে নিয়ে যায় দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায়। সেখানে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর টেলিভিশনে কাজ শুরু করেন। পরে বড় পর্দায় পা রাখেন।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে অবশ্য কৌতুক অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পাননি তিনি। রাম গোপাল ভার্মার ছবিতে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন। পরে ধীরে ধীরে কমেডি চরিত্রে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেন।
‘মুঝসে শাদি করোগি’, ‘চুপ চুপ কে’, ‘মালামাল উইকলি’, ‘ফির হেরা ফেরি’, ‘ঢোল’, ‘ভুল ভুলাইয়া’সহ অসংখ্য সিনেমায় ছোট-বড় চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মনে জায়গা করে নেন। অনেক সময় বড় তারকাদের পাশে থেকেও তাঁর অভিনয়ই দৃশ্যের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
তবে এই সাফল্যের অনেক আগেই তাঁর জীবনে নেমে এসেছিল এক ভয়াবহ ব্যক্তিগত বিপর্যয়।
২০ বছর বয়সেই স্ত্রীকে হারান
রাজপালের বয়স তখন মাত্র ২০ বছর। সংসার শুরু করেছিলেন। প্রথম সন্তানের জন্মের সময়ই মারা যান তাঁর প্রথম স্ত্রী।
পরে এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে অভিনেতা জানিয়েছিলেন, পরদিন স্ত্রীকে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু তার আগেই তাঁকে স্ত্রীর মরদেহ কাঁধে নিয়ে শ্মশানে যেতে হয়।
রাজপাল বলেছিলেন, তাঁর প্রথম স্ত্রী সন্তান প্রসবের সময় মারা যান। সদ্যোজাত মেয়েকে এরপর তাঁর পরিবারই বড় করে তোলে। মা ও শ্যালিকার সহায়তার কথা বিভিন্ন সময়ে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন অভিনেতা।
এত অল্প বয়সে স্ত্রীকে হারানোর শোক পেরিয়েও অভিনয়ের স্বপ্ন থেকে সরে যাননি তিনি।
নতুন করে সংসার, পাশে রাধা

রাজপাল যাদব। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে
২০০৩ সালে রাধা যাদবকে বিয়ে করেন রাজপাল। দ্বিতীয় স্ত্রীকে জীবনের অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন অভিনেতা। তাঁর প্রথম পক্ষের মেয়েকেও নিজের সন্তানের মতো করে গ্রহণ করেন রাধা।
এক সাক্ষাৎকারে স্ত্রীকে নিয়ে রাজপাল বলেছিলেন, তাঁর গুরু ও মা-বাবার পর রাধাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন করেছেন।এই সময়েই পেশাগত জীবনেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। বলিউডে কমেডির পরিচিত মুখ হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু নিজের সিনেমা নির্মাণের স্বপ্নই পরবর্তী সময়ে তাঁকে বড় আর্থিক সংকটে ফেলে দেয়।
নিজের সিনেমা বানাতে গিয়ে ঋণের শুরু
২০১০ সালে নিজের পরিচালনায় ‘আতা পাতা লাপাতা’ সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগ নেন রাজপাল। ছবিটির জন্য দিল্লিভিত্তিক মুরলি প্রজেক্টস প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে পাঁচ কোটি রুপি ঋণ নেন তিনি।
২০১২ সালে সিনেমাটি মুক্তি পেলেও বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। ফলে ঋণ পরিশোধে তৈরি হয় জটিলতা।পাওনাদার প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া একাধিক চেক বাউন্স করে। এরপর বিষয়টি আদালতে গড়ায়। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে মামলা, অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি এবং সময় চাওয়ার প্রক্রিয়া।
একসময় নিজের সিনেমা বানানোর স্বপ্নই তাঁর জীবনে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রাজপাল যাদব। অভিনেতার ইনস্টাগ্রাম থেকে
২০১৮ সালে প্রথম কারাবাস
চেক বাউন্স ও ঋণসংক্রান্ত মামলায় ২০১৮ সালে রাজপাল যাদবকে তিন মাস কারাগারে থাকতে হয়েছিল।পরে জেলজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়েও কথা বলেন তিনি। তাঁর দাবি, কারাগারে থাকার সময় নিজেকে গুটিয়ে রাখেননি। বরং অন্য বন্দীদের সঙ্গে মিশেছেন এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন।
কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পরও তাঁর আইনি জটিলতা শেষ হয়নি।
২০২৬ সালে আবার তিহারে
পুরোনো চেক বাউন্স মামলাগুলোর জেরেই চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আবার তিহার কারাগারে আত্মসমর্পণ করতে হয় রাজপালকে।আদালতকে অর্থ পরিশোধের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা পূরণ না হওয়ায় দিল্লি হাইকোর্ট তাঁর আত্মসমর্পণের সময় বাড়াতে রাজি হয়নি। ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি তিহার জেলে যান।
পরে দেড় কোটি রুপি জমা দেওয়ার পর অন্তর্বর্তী জামিনে মুক্তি পান অভিনেতা।তবে আইনি লড়াই সেখানেও থামেনি।
সাত চেক বাউন্স মামলায় সাজা বহাল
গত ১০ জুলাই দিল্লি হাইকোর্ট সাতটি চেক বাউন্স মামলায় রাজপাল যাদবের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বহাল রাখেন।আদালত প্রতিটি মামলায় তিন মাস করে সাধারণ কারাদণ্ডের সাজা বহাল রাখলেও নির্দেশ দেন, সাজাগুলো একই সঙ্গে কার্যকর হবে। পাশাপাশি প্রতিটি মামলায় ১ কোটি ৫ লাখ রুপি করে অর্থদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর আগে জমা দেওয়া ২ কোটি ২৫ লাখ রুপি চূড়ান্ত দায়ের সঙ্গে সমন্বয় করার কথাও আদালত জানিয়েছেন।আদালত তাঁর একাধিকবার অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও তা পূরণ না করার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছেন।
এবার পৈতৃক বাড়িও নিলামের মুখে
কারাগার ও আদালতের লড়াইয়ের মধ্যেই এবার সামনে এসেছে রাজপালের আরেক বড় দুশ্চিন্তা।৬ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া শাহজাহানপুরে রাজপালের পৈতৃক সম্পত্তি নিলামে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কুন্দ্রা গ্রামের পৈতৃক বাড়িতেও ব্যাংকের নোটিশ টাঙানো হয়েছে।
ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী, বকেয়ার পরিমাণ ১৬ কোটি ৬১ লাখ রুপির বেশি। ঋণের নথিতে রাজপালের স্ত্রী রাধা যাদব ও মা গোদাবরী দেবীর নামও রয়েছে।আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনলাইন নিলামের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ২০১০ সালে একটি সিনেমা নির্মাণের জন্য নেওয়া পাঁচ কোটি রুপির ঋণ থেকে যে সংকটের শুরু, সেটি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সেই ঋণের জেরে তাঁর পারিবারিক সম্পত্তিও নিলামে ওঠার পথে।
পর্দায় হাসি, বাস্তবে কঠিন লড়াই
রাজপাল যাদবের জীবন তাই শুধু একজন সফল কৌতুক অভিনেতার গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে ব্যক্তিগত শোক, সংগ্রাম, সাফল্য, স্বপ্ন এবং আর্থিক সংকটের গল্প।২০ বছর বয়সে স্ত্রীকে হারানোর পরও তিনি থেমে যাননি। ছোট শহর থেকে উঠে এসে বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। কমেডি চরিত্রে পেয়েছেন ব্যাপক জনপ্রিয়তা। কিন্তু নিজের সিনেমা নির্মাণের সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনে নিয়ে এসেছে দীর্ঘ এক আইনি ও আর্থিক লড়াই।
পর্দায় রাজপালের চরিত্রগুলো প্রায়ই বিপদে পড়ে, হোঁচট খায় কিংবা অসহায় পরিস্থিতিতে পড়ে দর্শককে হাসায়। বাস্তব জীবনের তাঁর বিপদ অবশ্য মোটেও হাসির নয়।
পুরোনো ঋণ ও চেক বাউন্স মামলায় কারাবাস, আদালতের সাজা, কোটি কোটি রুপির আর্থিক দায়ের পাশাপাশি এখন পৈতৃক সম্পত্তি হারানোর আশঙ্কাও সামনে এসেছে।
আগামী ৯ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত অনলাইন নিলাম তাই রাজপাল যাদবের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। যে সিনেমা একসময় ছিল তাঁর স্বপ্নপূরণের চেষ্টা, ১৬ বছর পর সেই সিনেমার ঋণই তাঁকে দাঁড় করিয়েছে সম্পত্তি হারানোর ঝুঁকির সামনে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au