মেলবোর্ন, ৭ আগষ্ট- বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসান বলেছেন, সরকার তাঁর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলে তিনি দুই বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরতে, আদালতে বিচার মোকাবিলা করতে এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় জানিয়ে একটি সিরিজ খেলতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে খেলারও আশা প্রকাশ করেছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাকিব বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, দুর্নীতি ও অন্যান্য অভিযোগে মামলা হওয়ায় তিনি দেশে ফিরতে পারেননি।
বর্তমানে ৩৯ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেননি। তিনি বলেন, দেশের মাটিতে একটি বিদায়ী সিরিজ খেলতে চান এবং ২০২৭ সালের বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামার লক্ষ্য রয়েছে।
রয়টার্সকে শ্রীলঙ্কা থেকে টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাকিব বলেন, “সরকার যদি আমার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে আমি দেশে ফিরে আদালতে বিচার মোকাবিলা করতে এবং যা যা প্রয়োজন সবই করতে প্রস্তুত।”
তিনি আরও বলেন, “আমি জানি, আমি কোনো অপরাধ করিনি।”
শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে পরিচিত সাকিবের এই মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন শেখ হাসিনাও আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অনুপস্থিত অবস্থায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।
সাকিব বলেন, তিনি অবিলম্বে দেশে ফিরতে চান। তবে তা সম্ভব না হলে শেখ হাসিনার সঙ্গে ফেরার বিষয়েও বিবেচনা করবেন।
তিনি বলেন, “ক্যাপ্টেন যা সিদ্ধান্ত নেবেন, আমরা সেটাই অনুসরণ করব। আমি মনে করি, তারা পরিস্থিতি ভালোভাবে বুঝবেন এবং আমরা তাদের নির্দেশনা মেনে চলব।”
সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সমালোচনার জবাবে সাকিব বলেন, সেখানে তিনি কেবল বাংলাদেশের শান্তি ও অগ্রগতির কথা বলেছেন এবং এ নিয়ে তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই।
তিনি বলেন, “আমি শুধু শান্তি এবং বাংলাদেশের উন্নতির কথাই বলেছি। এতে আমার কোনো অনুতাপ নেই।”
ওই সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মাগুরায় তাঁর পৈতৃক বাড়িতে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় বাড়ির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেউ হতাহত হননি।
সাকিব জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র, আইন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়সহ পুলিশের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা “মিথ্যা মামলা” প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছিল। তবে সে বিষয়ে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দেশে ফেরার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী বলেও জানান।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর প্রসঙ্গে সাকিব বলেন, তিনি এখনো বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলছেন এবং নিজের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট। তবে বয়সের বিষয়টি মাথায় রেখে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে চান না।
তিনি বলেন, “আমি এখনো বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলছি। ভালো লাগছে, খেলাও উপভোগ করছি এবং ভালো খেলছি। কিন্তু বয়স তো আর আমার পক্ষে নেই। তাই অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত বেশি দেরি করতে চাই না।”
সাকিব আরও জানান, ২০২৪ সালের শেষ দিকে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে তিনি দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে বিমানে উঠেছিলেন। বিমানবন্দর থেকে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাত্রার বিষয়টি নিশ্চিতও করেছিলেন। কিন্তু মাঝপথে তাঁকে ফিরে যেতে বলা হয়। পরে তিনি দুবাইয়ে নেমে আবার নিউইয়র্কে ফিরে যান।
তিনি বলেন, “১২ ঘণ্টার মধ্যে কী পরিবর্তন হয়েছিল, আমি এখনো জানি না।”
এরপর শেখ হাসিনার জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানোয় তাঁর আরেকটি দেশে ফেরার পরিকল্পনাও বাতিল হয়ে যায় বলে দাবি করেন সাকিব। তাঁর ভাষায়, এটিকেই দেশে ফিরতে না দেওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পারি না, জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো কীভাবে দেশে প্রবেশে বাধা দেওয়ার কারণ হতে পারে।”
আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করলে দেশে ফেরা সহজ হতে পারে, এমন পরামর্শও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
সাকিব বলেন, “এমন কিছু করার প্রশ্নই আসে না।”
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেছিলেন, অন্য সব ক্রিকেটারের মতোই সাকিবকেও নিরাপত্তা দেওয়া হবে। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করলে জনমনে ক্ষোভ কিছুটা কমতে পারে বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
সাকিব জানান, বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে দুটি মামলা সক্রিয় রয়েছে। একটি ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় এক বিক্ষোভকারীকে হত্যার অভিযোগে এবং অন্যটি দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের করা মামলা।
তিনি দাবি করেন, হত্যা মামলাটি করা হয়েছিল এমন এক দিনে, যেদিন তিনি কানাডার টরন্টোতে একটি ক্রিকেট ম্যাচ খেলছিলেন।
সাকিব বলেন, “এটি হাস্যকর একটি মামলা।”
তিনি জানান, এখনো তিনি কোনো প্রতিরক্ষা আইনজীবী নিয়োগ দেননি।
এ ছাড়া তদন্তের অংশ হিসেবে প্রায় দেড় বছর ধরে তাঁর ব্যাংক হিসাব জব্দ রয়েছে বলেও জানান সাকিব। তবে কোন ব্যাংকে হিসাব রয়েছে বা কত অর্থ জব্দ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বলতে চাননি।
তিনি বলেন, “আমি গত ১০ বছর দেশের সবচেয়ে বেশি কর দেওয়া খেলোয়াড়দের একজন। সব কর নিয়মমতো পরিশোধ করেছি। তারপরও দেড় বছর ধরে আমার হিসাব জব্দ করে রাখা হয়েছে। তদন্তে কিছু না পেলে সেটি ছেড়ে দেওয়া উচিত।”
সাকিব আরও বলেন, গত দুই বছরে তিনি বাংলাদেশে থাকা তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। তাঁর দাবি, তাঁর বাবা-মাকেও দেশের বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, “আমাদের সবার জন্য সময়টা খুব কঠিন ছিল। তারপরও আমরা টিকে আছি।”
সূত্রঃ আল জাজিরা