ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের মামলার রায় যেকোনো দিন
মেলবোর্ন, ১৮ আগষ্টঃ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার রায় যেকোনো দিন ঘোষণা…
মেলবোর্ন, ১৮ আগষ্টঃ বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্য, সমাজ ও সাধারণ মানুষের জীবনের গল্পকে নিজস্ব নান্দনিকতায় তুলে ধরেছিলেন পরিচালক রাজা সেন। মূলধারার বাণিজ্যিক ছবির চটক থেকে দূরে থেকে তিনি সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলেছেন মানুষের জীবনের টানাপোড়েন, নিঃসঙ্গতা, সম্পর্কের জটিলতা ও হারিয়ে যেতে থাকা মানবিক মূল্যবোধ। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তথ্যচিত্র ও টেলিভিশনেও সাহিত্যনির্ভর কাজের মাধ্যমে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন এই নির্মাতা।
সংবেদনশীলতা, সমাজমনস্কতা এবং বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ছিল রাজা সেনের নির্মাণশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিকদের সৃষ্টি ও দর্শনকে তিনি চলচ্চিত্রের দৃশ্যভাষায় রূপ দিয়েছেন। সাহিত্যের অক্ষরে থাকা আবেগ ও নীরবতাকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ছিল নিজস্ব দক্ষতা।
চলচ্চিত্র নির্মাণে তিনবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন রাজা সেন। ১৯৯৩ সালে সংগীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রের জন্য সাংস্কৃতিক চলচ্চিত্র বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পান তিনি। ১৯৯৬ সালে শিশুদের জন্য নির্মিত ‘দামু’ সেরা শিশু চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। ১৯৯৯ সালে ‘আত্মীয় স্বজন’ ছবির জন্য পরিবার কল্যাণমূলক চলচ্চিত্র বিভাগে আবারও জাতীয় পুরস্কার পান তিনি।
‘দামু’ রাজা সেনের সবচেয়ে স্মরণীয় চলচ্চিত্র গুলোর একটি। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পঞ্চাননের হাতি’ অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে গ্রামবাংলার সহজ-সরল মানুষ দামু ও এক শিশুর নির্মল সম্পর্কের গল্প তুলে ধরা হয়। শৈশবের সরল বিশ্বাস, ভালোবাসা ও মানবিক মূল্যবোধের উপস্থাপনা ছবিটিকে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে দেয়।
রাজা সেনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ছিল ‘নিমালু’। ছবিটি ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি টেলিভিশন ধারাবাহিক নির্মাণে মনোযোগ দেন। ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘দেশ আমার দেশ’, ‘বঙ্কিম সাহিত্যে নারী’ ও ‘সুবর্ণলতা’সহ বেশ কয়েকটি সাহিত্য নির্ভর ধারাবাহিক নির্মাণ করেন তিনি। এসব কাজেও সমাজ ও জীবনের মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়েছেন এই পরিচালক।
চলচ্চিত্রে সাহিত্যের রূপান্তরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’। প্রেম, প্রলোভন, পাপ ও অনুশোচনার মনস্তাত্ত্বিক গল্পকে ঊনিশ শতকের আবহে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন রাজা সেন। অন্যদিকে ‘আত্মীয় স্বজন’ ছবিতে নগরজীবনে যৌথ পরিবারের ভাঙন, বয়স্ক মানুষের একাকিত্ব ও পারিবারিক মূল্যবোধের সংকট উঠে এসেছে।
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের লেখা অবলম্বনে নির্মিত ‘মায়ামৃদঙ্গ’ ছবিতেও শিল্পীজীবনের টানাপোড়েন, প্রেম, শিল্পসৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা ও ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। রবীন্দ্র সাহিত্যের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা উঠে এসেছে ‘ল্যাবরেটরি’ ছবিতে। ‘দেবীপক্ষ’-এ তুলে ধরেছেন নারীর লড়াই, নিপীড়ন ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের শক্তি আবিষ্কারের গল্প।
রাজা সেনের নির্মাণে সমাজ ও রাজনীতির বাস্তবতাও বারবার উঠে এসেছে। ‘দেশ’ ছবিতে রাজনীতি, দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি একজন সৎ শিক্ষক ও প্রতিবাদী নারীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। ‘চক্রব্যূহ’ ছবিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র কীভাবে একজন সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করতে পারে, সেই প্রশ্ন সামনে এনেছেন তিনি।
তথ্যচিত্র নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে রাজা সেনের। তপন সিংহ, সুচিত্রা মিত্র, শম্ভু মিত্র, সমরেশ বসু ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন তিনি। শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে নির্মিত ‘সহস্রাব্দের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দুই বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি সংযোগও তুলে ধরেছেন।
বাংলার বিলীয়মান লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণেও কাজ করেছেন রাজা সেন। মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও বীরভূম অঞ্চলের লোকনাট্য ‘আলকাপ’ নিয়ে তাঁর একাধিক কাজ রয়েছে। এই লোকশিল্পের ইতিহাস, শিল্পীদের জীবন ও সংগ্রাম নথিবদ্ধ করার পাশাপাশি এর প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
কলকাতার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়েও পাঁচ পর্বের তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন রাজা সেন। শহরের অতীত ও ঐতিহ্যকে নতুন দৃষ্টিতে তুলে ধরেছিল সেই নির্মাণ। বাংলা টেলিভিশনে ‘কলকাতা কলকাতা’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’ ও ‘তারাশঙ্করের ছোট গল্প’-এর মতো সাহিত্যনির্ভর কাজও তাঁর সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে।
চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র ও টেলিভিশনে রাজা সেনের দীর্ঘ কাজের পরতে পরতে ছিল সাহিত্য, সমাজ ও মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। বাংলা শিল্প-সংস্কৃতির জগতে তাঁর নির্মাণ তাই শুধু চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অংশ নয়, সাহিত্য ও দৃশ্যশিল্পের মেলবন্ধনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সুত্রঃ আনন্দ বাজার পত্রিকা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au