নীরব সেল, পলাতক জঙ্গি ও নতুন আতঙ্ক: বাংলাদেশ আবার জঙ্গিবাদের ঝুঁকিতে
OTN বাংলা বিশেষ প্রতিবেদন: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক মাসের ব্যবধানে বোমা, বিস্ফোরক এবং বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের একাধিক ঘটনা সামনে…
‘এক ঠিকানায় সকল নাগরিক সেবা’ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে চালু করা হয়েছিল নাগরিক সেবাকেন্দ্র। পরিকল্পনা ছিল, এসব কেন্দ্রে বসেই পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, জিডি ও ভূমিসেবাসহ প্রায় ৪৫০ ধরনের সরকারি সেবা পাওয়া যাবে। কিন্তু চালুর এক বছরের মধ্যেই কার্যত অচল হয়ে পড়েছে উদ্যোগটি। ছয়টি কেন্দ্রের চারটিতে তালা ঝুলছে। বাকি দুটিও খোলে মাঝেমধ্যে, তবে সেবাপ্রার্থী খুব একটা আসেন না।
২০২৫ সালের ২৬ মে ঢাকার ছয়টি এলাকায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে নাগরিক সেবাকেন্দ্র চালু করা হয়। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এর উদ্বোধন করেন। প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
প্রকল্পটির আওতায় গুলশান, উত্তরা, নীলক্ষেত, গুলিস্তান, মোহাম্মদপুর ও বনশ্রীতে ছয়টি সেবাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সনদও দেওয়া হয়েছিল।
পরিকল্পনা ছিল, নাগরিকেরা এসব কেন্দ্রে এসে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেবেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর সেবা বুঝে নেবেন। পাসপোর্টের মতো সেবার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অফিসে না গিয়েও আবেদন ও বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়ার সুযোগ রাখার কথা ছিল।
কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনা আর এগোয়নি।
মোহাম্মদপুর কেন্দ্রে নেই কেউ
২৭ আগস্ট মোহাম্মদপুরের নাগরিক সেবাকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, মোহাম্মদপুর সাব-পোস্ট অফিসের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে দুটি টেবিল ও কয়েকটি চেয়ার অগোছালো অবস্থায় পড়ে আছে। সেখানে কোনো সেবাদানকারী বা সেবাপ্রার্থী ছিলেন না।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নাগরিক সেবা কেন্দ্র এভাবেই পড়ে আছে। ছবি: সংগৃহীত
সাব-পোস্ট অফিসের কর্মীরা জানান, কার্যক্রম শুরুর পর কয়েক দিন একজন উদ্যোক্তা ল্যাপটপ নিয়ে সেখানে বসতেন। কিছুক্ষণ পর চলে যেতেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে আর দেখা যায়নি।
এই কেন্দ্রের উদ্যোক্তা ছিলেন মো. মুস্তাকিম। তিনি আগে কম্পিউটার সেবার একটি দোকান চালাতেন। নাগরিক সেবাকেন্দ্রে নিয়মিত আয় হবে এমন আশায় আগের পেশা ছেড়ে উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন।
মুস্তাকিম জানান, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ থেকে সেগুলো দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি সেবাপ্রার্থীও আসতেন না। এ কারণে তিনিও আর কেন্দ্রে যান না।
চার কেন্দ্রে তালা
সরেজমিনে ঘুরে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছয়টি নাগরিক সেবাকেন্দ্রের মধ্যে চারটিই এখন বন্ধ। দুটি কেন্দ্র মাঝেমধ্যে খোলা হলেও সেখানে সেবা নিতে মানুষের উপস্থিতি খুবই কম।
নীলক্ষেতের কেন্দ্রটি বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) কার্যালয়ের দুটি কক্ষ নিয়ে চালু হয়েছিল। ২৭ আগস্ট সেখানে গিয়ে দরজায় তালা দেখা যায়।একজন নিরাপত্তাকর্মী জানান, কেন্দ্রটির উদ্যোক্তাকে এখন আর দেখা যায় না। তবে মাঝেমধ্যে সাইনবোর্ড দেখে দু-একজন সেবাপ্রার্থী সেখানে এসে কাউকে না পেয়ে ফিরে যান।
এই কেন্দ্রের উদ্যোক্তা রাজিত খান বলেন, যেসব সেবা দেওয়ার কথা ছিল, তার কোনোটিই ঠিকমতো দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। সংসার চালানোর জন্য আয় প্রয়োজন হওয়ায় তিনি কেন্দ্রটি বন্ধ রেখে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন।
গুলিস্তানের কেন্দ্রটিও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসের ভেতরে। ২৭ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সেখানে গিয়েও দরজায় তালা দেখা যায়। আশপাশে কোনো সেবাপ্রার্থীও ছিলেন না।

রাজধানীর গুলিস্তানে নাগরিক সেবা কেন্দ্র বন্ধ। গত বৃহস্পতিবারে তোলা। ছবি: সংগৃহীত
উত্তরার উদ্যোক্তা আশিকুর রহমান জানান, কক্ষ ও আসবাব প্রস্তুত করা হলেও সেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাননি। শুরুতে নিজের ল্যাপটপ ব্যবহার করে কাজ চালিয়েছেন। পাসপোর্ট অফিস থেকে একটি বায়োমেট্রিক যন্ত্র দেওয়া হলেও কয়েক মাস আগে সেটিও ফেরত নেওয়া হয়েছে।
‘লোকদেখানো উদ্যোগ’
প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত আইসিটি বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উদ্যোগটি মূলত ‘ওপরে ওপরে’ নেওয়া হয়েছিল। সরকার এটিকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করতে চাইলে আলাদা বাজেট, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রচারের ব্যবস্থা করা হতো।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, কেন্দ্র চালুর পর সরকারি উদ্যোগে ইন্টারনেট সংযোগও নিশ্চিত করা হয়নি। সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি না থাকায় তাঁরাও সরকারি নামে নিজেদের উদ্যোগে ইন্টারনেট সংযোগ নিতে পারেননি।
ফলে শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অভাবে সেবাকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।
‘প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি’
বর্তমান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নাগরিক সেবা উদ্যোগ বন্ধের ঘোষণা দেয়নি। তবে কেন্দ্রগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে আইসিটি বিভাগের ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও সিকিউরিটি অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মজিবর রহমান বলেন, ‘নাগরিক সেবাকেন্দ্রের কার্যক্রম খুব বেশি টেকসই হয়নি। প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি। তাই এ নিয়ে আর এগোয়নি সরকার।’
তবে প্রয়োজনে ভিন্নভাবে উদ্যোগটি আবার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, প্রকল্পটির অন্যতম উদ্যোক্তা ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বক্তব্য জানতে বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইউডিসির মতো উদ্যোগ, নতুন পরিকল্পনাও
নাগরিক সেবাকেন্দ্রের কাঠামো ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের (ইউডিসি) অনেকটা মিল রয়েছে। আগের সরকারের সময়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে এসব ডিজিটাল সেন্টার চালু করা হয়েছিল। তবে সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে।
আইসিটি বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকার এখন ‘রুরাল ডিজিটাল সেন্টার’ নামে নতুন ধরনের সেবাকেন্দ্র চালুর কথা ভাবছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, তাড়াহুড়া করে নতুন কোনো উদ্যোগ না নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
আগের উদ্যোগগুলো কেন সফল হয়নি, সেটিও বিশ্লেষণ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, টেকসই সমাধান ছাড়া একের পর এক নতুন উদ্যোগ নিলে শুধু উদ্যোগের সংখ্যা বাড়বে, সমস্যার সমাধান হবে না।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au