পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদ। ছবিঃ সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্ত, তদন্ত কমিটি গঠন ও হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদ। সংগঠনটির দাবি, রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও শিক্ষকদের মৌলিক অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান সংগঠনের আহ্বায়ক ডা. জামাল উদ্দিন চৌধুরী ও সদস্য সচিব কৃষিবিদ মিজানুর রহমান।
বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থানের অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ পাবলিক প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সভাপতি এবং পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদের কো-কনভেনার ড. এম. অহিদুজ্জামান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটুকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্তে সংগঠনটি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিবেচনায় তদন্ত কমিটি গঠন এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিরত থাকতে হবে। এ ধরনের পদক্ষেপ শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করার পাশাপাশি শিক্ষকদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করে দেশে নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সামনে এসেছে। এর প্রভাব শিক্ষাঙ্গনেও পড়েছে বলে দাবি করে সংগঠনটি। তাদের ভাষ্য, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মব সৃষ্টি, শারীরিক আঘাত, মানসিক হয়রানি, চাকরিচ্যুতি ও পদাবনতির মতো ঘটনা ঘটেছে।
পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদের দাবি, এসব ঘটনার কারণে অনেক শিক্ষক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাকরিচ্যুতি বা হয়রানির মতো পরিস্থিতি শিক্ষকদের চরম মানসিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
সংগঠনটি আরও দাবি করে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। এ অস্থিরতার পেছনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল বলে অনেকেই মনে করেন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিবৃতিতে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়নি।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা। একই সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক মতের ভিত্তিতে শিক্ষকদের হয়রানি বন্ধে প্রশাসনকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার প্রত্যাশাও ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে এ বিষয়ে জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদ অভিযোগ করেছে, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন এবং সাময়িক বরখাস্তের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপিকা ড. সাদেকা হালিমের সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও সংগঠনটির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আজমল হোসেন ভূইয়াসহ কয়েকজন শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. আহসান হাবীব হেলাল, অধ্যাপক ডা. সুবাস দেসহ ৩৬ জন শিক্ষক-চিকিৎসককে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. পূর্বা ইসলামসহ শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সাধারণ সম্পাদক ড. মাহবুবর রহমানের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টিও উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। এসব তদন্ত কমিটির কার্যক্রমের নিয়মনীতি, নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদ।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মুক্তচিন্তা, রাজনৈতিক মত প্রকাশ এবং স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার অধিকার রয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ভিন্নমতের কারণে কোনো শিক্ষককে হয়রানি বা শাস্তির মুখোমুখি করা হলে তা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের বিভাজন তৈরি করতে পারে।
তাদের দাবি, শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষিবিদসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর বিরুদ্ধে যেসব নিবর্তনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনে সম্প্রীতি ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদ বলেছে, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, প্রচলিত আইন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি এবং ন্যায়সংগত তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত। একই সঙ্গে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তারা।