সোহাগী জাহান তনু। ছবি: সংগৃহীত
কুমিল্লার আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় দুই সাবেক সেনাসদস্য মো. জাহিদুজ্জামান ও মো. শাহীন আলমের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি হয়েছে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল তাঁদের বিরুদ্ধে পৃথক রেড নোটিশ জারি করে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য, সাক্ষ্য ও অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলমকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁরা বর্তমানে দেশের বাইরে পলাতক বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মামলার তদন্তে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসার পর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে তাঁদের বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম জানান, পলাতক দুই অভিযুক্তকে শনাক্ত, তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত এবং গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি), ঢাকার মাধ্যমে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চাওয়া হয়।
পিবিআইয়ের অনুরোধের পর প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি যাচাই করে ইন্টারপোল তাঁদের বিরুদ্ধে পৃথক রেড নোটিশ জারি করেছে।
এর আগে গত ৮ জুন কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন এবং তাঁদের বিষয়ে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তনু হত্যাকাণ্ডের সময় জাহিদুজ্জামান কুমিল্লা সেনানিবাসে সার্জেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আর শাহীন আলম ছিলেন সৈনিক।
তদন্তে তাঁদের উপস্থিতি ও মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার কথা আদালতকে জানিয়েছিল পিবিআই। আদালতের আদেশে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পুলিশি সহযোগিতা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ মামলায় এর আগে সাবেক সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার। ২০২৩ সালে তিনি অবসর নেন। তনু হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন।
তদন্ত কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম জানান, গত ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং বর্তমানে তিনি মামলায় কারাগারে ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর জামিনসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়াও হয়েছে।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে যান তনু। এরপর তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। পরে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের কাছের ঝোপ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরদিন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
তনুর মৃত্যুর ঘটনায় ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন দুই দফা ময়নাতদন্ত করা হয়। তবে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ দুই প্রতিবেদনেই মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করতে পারেনি।
প্রথমে থানা পুলিশ, পরে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলাটি তদন্ত করে। দীর্ঘ সময়েও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত না হওয়ায় বর্তমানে মামলাটি পিবিআই তদন্ত করছে।
ইন্টারপোলের রেড নোটিশের মাধ্যমে সদস্যদেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো পলাতক ব্যক্তিদের শনাক্ত ও অবস্থান নির্ণয়ে সহযোগিতা করতে পারে। কোনো দেশে তাঁদের অবস্থান শনাক্ত হলে ওই দেশের আইন ও প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা কাঠামো অনুযায়ী গ্রেপ্তার ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
তবে রেড নোটিশ নিজে কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। সংশ্লিষ্ট দেশে গ্রেপ্তার বা প্রত্যর্পণের বিষয়ে সেই দেশের নিজস্ব আইন ও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হয়।