রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বয়ান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, বিভিন্ন সূত্র এবং ঘটনার ওপর নজর রাখা একটি গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণে পুলিশের তদন্তের গতিপ্রকৃতি, দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে আসামি করা এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ইয়াবা সেবনের যে গল্প সামনে আনা হয়েছে, তা নিয়ে একাধিক অসঙ্গতির কথা উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত হওয়ার পাশাপাশি ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকে যে বয়ান তৈরি করা হয়েছে, সেটিও পরিকল্পিতভাবে দাঁড় করানো হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ঘটনাটি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাটি দুই যুবক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে মামলায় আসামি করার বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির ধারণা, হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ জানার কারণে তাদের মুখ বন্ধ রাখতে ওই দুই যুবককে ফাঁসানো হয়ে থাকতে পারে।
ওই গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, অস্বাভাবিকভাবে গ্রেপ্তার এবং ইয়াবা সেবনের বয়ানটি একটি ‘পূর্বপরিকল্পিত’ প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। এ ঘটনায় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ এবং গোয়েন্দা শাখার উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি ভবিষ্যতে সরকারের জন্য ‘অস্বস্তির কারণ’ হতে পারে বলেও সংস্থাটি সতর্ক করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তদন্ত অন্যদিকে নেওয়ার অভিযোগ
রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদের মাধ্যমে পুলিশ প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে তদন্তের গতিপথ ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ। এমনকি তার প্রভাবের কারণে রংপুরের আইনজীবীদের একটি অংশ গ্রেপ্তার হওয়া দুই যুবকের জামিন শুনানিতে তাদের পক্ষে দাঁড়াতে অনীহা দেখিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেছে কি না, তা প্রতিবেদনে থাকা তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হত্যার পরিকল্পনায় কারা?
স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রের অভিযোগ, নিহত পরিবারের বাড়ির পাশের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের খানকাহ শরিফের পরিচালক ও আয়কর আইনজীবী আসাদুজ্জামান প্রধান লালু এবং রংপুর মহানগর পূজা উদ্যাপন কমিটির সহসভাপতি ও দাসপাড়া কালীমন্দিরের পুরোহিত ধীমান ভট্টাচার্যের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সূত্রগুলোর দাবি, তারা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন।
তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
সিদ্ধার্থ-মুগ্ধকে ঘিরে যত প্রশ্ন
হত্যাকাণ্ডের পর সন্দেহভাজন হিসেবে আটক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস পরস্পরের চাচাতো ভাই। ১৯ বছর বয়সী সিদ্ধার্থ মচ্ছুয়াপাড়ার কীর্তনশিল্পী বিমল চন্দ্র দাস ও পাপড়ি দাসের ছেলে। তিনি রংপুর নগরীর পিকে জুয়েলার্সে কাজ করতেন।
অন্যদিকে মুগ্ধ পেশায় শ্রমিক ও ধর্মীয় কীর্তনশিল্পী কানুদাস ও সোনারানি দাসের ছেলে। তিনি রংপুর সিটি বাজারের রামনাথের মাছের আড়তে কাজ করতেন।
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের মধ্যে ঘন ঘন ফোনে যোগাযোগ হয়েছিল। পুলিশের কল ডিটেইল রেকর্ড বা সিডিআর বিশ্লেষণে তাদের মধ্যে প্রায় ৮০ ঘণ্টার সময়ের মধ্যে ৮০ বার কথা হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
গত ৩১ আগস্ট সোমবার বিকেলে রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরের সময়কে বিবেচনায় নিলে দুই যুবকের মধ্যে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় একবার করে ফোনে কথা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এই মাত্রার যোগাযোগ অস্বাভাবিক।
কিন্তু এখানেই তদন্ত নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন উঠছে। কোনো ঘটনা সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয়ে একজন ব্যক্তি তার স্বজনকে বারবার ফোন করতে পারেন কি না, নাকি ওই যোগাযোগের পেছনে অপরাধমূলক উদ্দেশ্য ছিল, তা কেবল ফোনের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাদের কথোপকথনের বিষয়বস্তু, অবস্থান, সময় এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ বিশ্লেষণ করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
ইয়াবার গল্পেও অসঙ্গতি?
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে ছাদে বসে নয়টি ইয়াবা সেবনের কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু পরে তাদের শরীরে মাদকজাতীয় কোনো উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, আদালতের নির্দেশে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে তাদের প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষা করা হলে তাদের শরীরে কোনো মাদক পাওয়া যায়নি।
এ তথ্য প্রকাশের পর স্থানীয় বাসিন্দা ও গণমাধ্যমের একটি অংশে পুলিশের আগের বয়ান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে যদি তারা সত্যিই গ্রেপ্তারের আগে বা পরপরই নয়টি ইয়াবা সেবন করে থাকেন, তাহলে গ্রেপ্তারের পরপরই কেন মাদক পরীক্ষা করা হয়নি, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবায় থাকা অ্যামফেটামিন বা মেথঅ্যামফেটামিনজাতীয় উপাদান শরীরে নির্দিষ্ট সময়ের পর পরীক্ষায় ধরা নাও পড়তে পারে। ফলে পরে মাদক পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল পাওয়া মানেই গ্রেপ্তারের সময় তারা মাদক সেবন করেননি, এমন সিদ্ধান্তও এককভাবে দেওয়া যায় না। একইভাবে শুধু কথিত স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেও তাদের মাদক সেবন নিশ্চিত করা যায় না।
এই জায়গাতেই তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, গ্রেপ্তারের পরপরই তাদের মেডিকেল পরীক্ষা বা মাদক পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে তার ফল কী ছিল।
রিমান্ড চেয়েও পেল না পুলিশ
দুই যুবককে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশ। তবে আদালত সেই আবেদন নাকচ করেন।
আদালত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করা জবানবন্দি এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নেন বলে জানা গেছে।
পরে সোমবার বিকেলে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম কারাগারের ফটকে দুই আসামিকে দুই দিন ধরে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন।
এতে তদন্তের পরবর্তী ধাপ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ পুলিশের হাতে থাকা সিডিআর, কথিত স্বীকারোক্তি এবং মাদক সেবনের অভিযোগের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার শারীরিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কী রয়েছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রংপুরে একসঙ্গে হত্যার শিকার হয়েছেন এক পরিবারের চারজন। গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর পারিবারিক ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতিছবি: সংগৃহীত
২২ আগস্ট উদ্ধার হয় চারজনের মরদেহ
গত ২২ আগস্ট রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় একটি বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন।
প্রথমে মামলাটির তদন্ত করছিল কোতোয়ালি থানা পুলিশ। পরে তদন্তের দায়িত্ব মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।
হত্যার সময় নিয়ে নতুন তথ্য
ঘটনা পর্যবেক্ষণকারী একটি গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, পরিবারের সদস্যদের রাতের খাবার শেষ হওয়ার পর মধ্যরাত থেকে রাত ১টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনায় অন্তত ছয়জন জড়িত ছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ওই সূত্রের দাবি, হামলাকারীদের একজন নিহত পরিবারের পরিচিত ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ব্যক্তি পরিবারের সঙ্গে খাবারেও অংশ নিয়েছিলেন। পরে পরিবারের অগোচরে অন্যদের বাড়িতে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
যদি এই তথ্য সত্য হয়, তাহলে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, নিহত পরিবারের সঙ্গে কার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং হত্যার রাতে কে বা কারা ওই বাড়িতে প্রবেশ করেছিলেন। একই সঙ্গে বাড়ির ভেতরে-বাইরে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের অবস্থান, কল রেকর্ড, প্রতিবেশীদের বক্তব্য, খাবারের সময়সূচি এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া বৈজ্ঞানিক আলামত পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
পুলিশের বয়ান বনাম প্রশ্নের মুখে তদন্ত
এই হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকেই স্থানীয় বাসিন্দা এবং গণমাধ্যমের একটি অংশ পুলিশের দেওয়া বয়ান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে গ্রেপ্তার, তাদের বিরুদ্ধে ইয়াবা সেবনের অভিযোগ এবং পরে মাদক পরীক্ষায় কোনো মাদক না পাওয়ার বিষয়টি পুলিশের বয়ানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে কোনো তদন্তে প্রাথমিক পর্যায়ে পাওয়া তথ্য পরবর্তীতে পরিবর্তিত বা সংশোধিত হতে পারে। তাই পুলিশের বক্তব্য ভুল প্রমাণিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে তদন্তের সব নথি, ফরেনসিক প্রতিবেদন, ময়নাতদন্তের তথ্য, সিডিআর, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এই মামলায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ প্রকৃতপক্ষে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কি না, নাকি তারা এমন কোনো তথ্যের কারণে পুলিশের সন্দেহের কেন্দ্রে এসেছেন যা তদন্তের অন্য একটি দিক উন্মোচন করতে পারে।
একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী, পরিবারের পরিচিত ব্যক্তির ভূমিকা এবং ঘটনার রাতে বাড়িতে কারা প্রবেশ করেছিলেন, সে প্রশ্নগুলোর উত্তরও বের করা জরুরি।
পাঁচজন মানুষকে হত্যার মতো গুরুতর ঘটনায় শুধু স্বীকারোক্তি বা সন্দেহের ওপর নির্ভর না করে স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তদন্তের শুরুতেই যদি কোনো নির্দিষ্ট বয়ানকে সত্য ধরে নেওয়া হয়, তাহলে প্রকৃত হত্যাকারী বা হত্যার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীরা আড়ালে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ
আরও পড়ুন-