বাংলাদেশ

বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে লড়ছে বাংলাদেশ

  • 6:39 pm - September 10, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৪ বার
হাম।ছবি: সংগৃহীত

একসময় হাম নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম-সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯৯-এ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল মাসে দেশজুড়ে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হলেও প্রাদুর্ভাব দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এর পেছনে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্নকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই সময় প্রাণঘাতী গণঅভ্যুত্থানের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যায় বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিয়মিত টিকাদান থেকে বাদ পড়া শিশু এবং টিকা সরবরাহের সমস্যার কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু হাম আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ, নিয়মিত সূচি অনুযায়ী এই বয়সের আগে শিশুদের হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে রোগটির সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে টিকাদানের এই ঘাটতি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে বর্তমান প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে দেশে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া আক্রান্তের সংখ্যা ১৯ হাজার ৮৩৫।

এই প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে ৯৯৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১০০টি মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামজনিত বলে শনাক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতির জন্য কর্মসূচির দুর্বল তদারকি, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা ও স্বাস্থ্যসামগ্রী সংগ্রহের নীতিতে পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্নকে হাম প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। রোগটির বিস্তারের প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

বাংলাদেশে হাম নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের ক্ষেত্রে কয়েক বছর ধরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। গত এক দশকের বেশির ভাগ সময় দেশে হাম প্রতিরোধী টিকার আওতা উচ্চ পর্যায়ে ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, হাম নির্মূলের জন্য প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি টিকাদানের হারও বেশির ভাগ সময় ধরে বজায় ছিল। তবে কোভিড-১৯ মহামারির সময় এই হার কিছুটা কমে যায়।

মহামারিবিদ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানে ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি।

তিনি বলেন, তাঁর জানা মতে, বাংলাদেশে এর আগে কখনো হাম আক্রান্ত হয়ে এত শিশুর মৃত্যু হয়নি। একইভাবে এক বছরে এত বিপুলসংখ্যক হাম রোগীও দেখা যায়নি। পরিস্থিতিকে তিনি অত্যন্ত ভয়াবহ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই রোগে আক্রান্ত ও মৃতদের বড় অংশই শিশু।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন দেশটি কয়েক বছর ধরে হাম নির্মূলের লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। নিয়মিত টিকাদানের উচ্চ হার বজায় রাখার কারণে হাম নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিয়মিত টিকাদানে ব্যাঘাত এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে সেই অগ্রগতিতে বড় ধরনের ধাক্কা এসেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, তাদের একটি বড় অংশ এখন সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ ঠেকাতে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানুষের টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি। টিকাদানের হার কমে গেলে রোগটির বিস্তার দ্রুত বাড়তে পারে। আর শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই শুধু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়াই যথেষ্ট নয়। যেসব শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের শনাক্ত করে দ্রুত টিকার আওতায় আনা, টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির নজরদারি জোরদার করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চলমান প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হাম নির্মূলের ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরের অর্জন ধরে রাখা। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে নতুন করে কোনো বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হলে ভবিষ্যতেও হাম সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের ভাষায়, বাংলাদেশে এক বছরে হাম আক্রান্ত ও মৃতের এমন সংখ্যা আগে দেখা যায়নি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং শিশুদের সুরক্ষা ও দেশের টিকাদান ব্যবস্থার জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।

সূত্রঃ দ্য ক্যানবেরা টাইমস

এই শাখার আরও খবর

মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিতে প্যারোলে মুক্তি চান চিন্ময় কৃষ্ণ দাস

সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মা সন্ধ্যা রানি ধর মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রামের পুণ্ডরীক ধামে চিকিৎসাধীন অবস্থায়…

‘আর ইউ ওকে?’ দিবসের বার্তা: প্রশ্ন করলেই হবে না, শুনতে ও জানতে হবে

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা অনেকের কাছেই সহজ নয়। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী, বন্ধু কিংবা পরিচিত কাউকে তার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে সরাসরি প্রশ্ন করতে গিয়ে…

ডব্লিউএইচওর পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল

বিভিন্ন অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সায়মা ওয়াজেদ। তিনি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে।…

একই কলেজের আট হিন্দু শিক্ষকের কাছে চাঁদা দাবি, হত্যার হুমকি

ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে ‘সর্বহারা পার্টির’ সদস্য পরিচয়ে একটি কলেজের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আট শিক্ষককে মুঠোফোনে হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। টাকা না দিলে শিক্ষক ও…

ছেলেকে একনজর দেখার তৃষ্ণা নিয়েই মারা গেলেন চিন্ময় প্রভুর মা

কারাগারে থাকা ছেলে সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে একনজর দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল মা সন্ধ্যা রাণী ধরের। অসুস্থ অবস্থায় ছেলেকে দেখতে প্যারোলে…

মাদ্রাসা নিয়ে কটূক্তিমূলক পোস্টের অভিযোগে হিন্দু স্কুলশিক্ষক আটক

রাজশাহীর চারঘাটে মাদ্রাসা শিক্ষা ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে নারায়ণ চন্দ্র (৫০) নামে এক স্কুলশিক্ষককে আটক করেছে পুলিশ। তাঁর…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au