শেষ মুহূর্তে স্থগিত শেখ হাসিনার দিল্লি বৈঠক। ছবিঃ সংগৃহীত
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার ১৮ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় বৈঠক শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। বৈঠকটি শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একটি উচ্চপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ পরামর্শ বৈঠক হিসেবে হওয়ার কথা ছিল। এতে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা, দলের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কাঠামো এবং বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের করণীয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।
নর্থইস্ট নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকটি ১৮ সেপ্টেম্বর হওয়ার কথা থাকলেও এর আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর তা বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। দলীয় অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হঠাৎ সিদ্ধান্তে দলের নেতাদের অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। তবে বৈঠক বাতিলের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি এবং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এর আগে অন্তত দুই জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কথা বলে ১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল নর্থইস্ট নিউজ। বৈঠকে শেখ হাসিনার সঙ্গে কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তাঁদের অনেকেই বর্তমানে কলকাতায় অবস্থান করছেন। বৈঠকের প্রস্তুতি হিসেবে কয়েকজন নেতা দিল্লিতেও পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের কাছে শেষ মুহূর্তে বৈঠক বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরানো হয়েছিল বৈঠক
প্রাথমিকভাবে বৈঠকটি কলকাতায় আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে নিরাপত্তা ও লজিস্টিক কারণে স্থান পরিবর্তন করে নয়াদিল্লি নির্ধারণ করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৮ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার সঙ্গে নেতাদের সরাসরি আলোচনায় বসার কথা ছিল।
বৈঠকটি বাতিল হওয়ায় নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশে দলটির অবস্থান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না।
তবে বৈঠকটি ভবিষ্যতে অন্য কোনো তারিখে আয়োজন করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করবেন কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
দেশে ফেরা নিয়ে আলোচনার কথা ছিল
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়ে গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।
১৮ সেপ্টেম্বরের প্রস্তাবিত বৈঠকটি তাই আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ একটি সাধারণ সাংগঠনিক বৈঠকের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। বৈঠকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে নর্থইস্ট নিউজ জানিয়েছে।
এর আগে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের নেতারা নানা বক্তব্য দিয়েছেন। তবে ১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে এ বিষয়ে দলীয় পর্যায়ে কী ধরনের সিদ্ধান্ত বা আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, তার কোনো আনুষ্ঠানিক এজেন্ডা প্রকাশ করা হয়নি।
ভারতের সঙ্গে প্রত্যর্পণ নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ
এদিকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের বাংলাদেশে ফেরাতে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে চিঠিপত্রের আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে ভারত সরকারের কাছ থেকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি বলেও জানান শামা ওবায়েদ।
শামা ওবায়েদ বলেন, বিদ্যমান বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি ও প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় শেখ হাসিনা এবং ভারতে অবস্থানরত অন্য আসামিদের ফেরানোর বিষয়ে কাজ চলছে। সাম্প্রতিক একটি মামলায় আওয়ামী লীগের সাত নেতার সাজা ঘোষণার পর আদালতের প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাওয়ার পর যথাযথ প্রক্রিয়ায় ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথাও জানান তিনি।
এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ১৫ সেপ্টেম্বর বলেন, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ পলাতক ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হস্তান্তর দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
শেখ হাসিনার ফেরার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আইনি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য কূটনৈতিক ও আইনগত উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর শামা ওবায়েদ বলেন, ভারত থেকে সাজাপ্রাপ্ত ও পলাতক ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।
এর আগে জুলাইয়ে শামা ওবায়েদ জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে তাঁকে আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁর প্রত্যর্পণের বিষয়টি ভারত-বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎও ছিল আলোচনায়
১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে শুধু শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয় নয়, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম, কেন্দ্রীয় নেতাদের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে নানা আলোচনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত দিল্লি বৈঠনটি ছিল প্রকাশ্য কোনো রাজনৈতিক অনুষ্ঠান নয়। এটি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ পরামর্শ বৈঠক হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ফলে সেখানে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা সম্ভব হলে দলের ভূমিকা কী হবে এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দল কীভাবে নিজেদের সংগঠিত করবে, সেসব বিষয় আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
এর আগে ২৯ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে ঘিরে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার সেটিকে স্বাগত জানিয়েছিল। পরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়, সেটি দলের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান ছিল না এবং দলটি ওই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত, আয়োজক বা পৃষ্ঠপোষক ছিল না।
১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। এটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠান নয়, বরং দলীয় নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার অভ্যন্তরীণ পরামর্শ বৈঠক হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এখন সামনে কয়েকটি প্রশ্ন
শেষ মুহূর্তে বৈঠক স্থগিত হওয়ায় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। বৈঠকটি পরে অন্য কোনো তারিখে হবে কি না, শেখ হাসিনা জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা করবেন কি না এবং তাঁর দেশে ফেরা ও দলটির ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে অন্য কোনো পদ্ধতিতে আলোচনা হবে কি না, সেসব এখনো পরিষ্কার নয়।
বৈঠকটি বাতিলের কোনো আনুষ্ঠানিক কারণও এখন পর্যন্ত জানানো হয়নি। ফলে কেন এক দিন আগে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যায় যাওয়ার সুযোগ নেই।
তবে বৈঠকটি যে সময়ে হওয়ার কথা ছিল, সেই সময়ে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা রয়েছে। ফলে বৈঠকটি স্থগিত হওয়ার পর এর সম্ভাব্য নতুন তারিখ এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে দলীয় নেতাদের পরবর্তী যোগাযোগের দিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ