শেষ মুহূর্তে স্থগিত শেখ হাসিনার দিল্লি বৈঠক, নতুন পরিকল্পনা কী?
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার ১৮ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় বৈঠক শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে।…
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থপাচার, সরকারি পদে নিয়োগ ও পদায়নে অর্থ লেনদেন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধান চলাকালে তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যেতে পারেন এবং এতে অনুসন্ধান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে, এমন আশঙ্কায় তাঁর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।
দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে আজকের পত্রিকা জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধান চলাকালে তিনি দেশত্যাগ করলে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে তাঁর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হবে। একই তথ্য ইত্তেফাক, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডসহ আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমও জানিয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচার, সরকারি পদে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে অর্থ লেনদেন, টেন্ডার-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের তথ্য-উপাত্ত যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নথিপত্র সংগ্রহ করে যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে দুদক।
এরই মধ্যে আসিফ মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রীর দেশ-বিদেশের সম্পদ, ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে চিঠি দিয়েছে দুদক। পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে জমি কেনা, অর্থপাচার ও বিদেশি বিনিয়োগের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য ও নথি চাওয়া হয়েছে। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. জাহেদ কালামের সই করা চিঠির সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে এসব অর্থ পাচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিদেশে পাচার করা অর্থ দিয়ে ভিলা ও অন্যান্য সম্পদ কেনা এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। এ ছাড়া পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে অর্থ রাখার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। তবে এসব তথ্য এখনো অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে এবং দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তানজির আহমেদ জানিয়েছিলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে পাওয়া নতুন অভিযোগগুলো আগে থেকে চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগের পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন পদে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুদক।
দুদকের কাছে আসা অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার-বাণিজ্য এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে ব্যয় বৃদ্ধির অভিযোগও অনুসন্ধানে এসেছে। শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও অনুসন্ধানের অংশ বলে জানিয়েছে আজকের পত্রিকা।
আসিফ মাহমুদ অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগেও দুদক অনুসন্ধান করছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ও সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাদের পদায়ন ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেন হয়েছে। পদোন্নতির পর পছন্দের জায়গায় পদায়নের ক্ষেত্রেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করা কয়েকজন ব্যক্তি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও অর্থ লেনদেন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। পরে নতুন করে পাওয়া অভিযোগগুলোও ওই অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করার কথা জানায় সংস্থাটি।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং দুদকের কিছু বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন আসিফ মাহমুদ। তিনি দাবি করেছেন, কোনো অনুসন্ধানের চূড়ান্ত ফলাফল বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশের আগেই তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে এমনভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে, যাতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে বলে ধারণা তৈরি হতে পারে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর তিনি দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর পক্ষে আইনজীবীর মাধ্যমে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের কাছে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। সেখানে দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। পরে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক পোস্টে আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, তদন্তের ফলাফল প্রকাশের আগেই তাঁর বিরুদ্ধে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ শুরু হয়েছে।
দুদকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমানে যেসব তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চলছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ফলে অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ এখনো নেই।
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে দুদকের সিদ্ধান্তও বর্তমানে আবেদন করার পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হলে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au