বিশ্ব

এআইয়ের ভুলে চীনা জাহাজে হামলার প্রস্তুতি, অল্পের জন্য এড়াল নতুন যুদ্ধ

  • 12:22 am - September 20, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৬০ বার
এআইয়ের ভুলে চীনা জাহাজে হামলার প্রস্তুতি, অল্পের জন্য এড়াল নতুন যুদ্ধ। ছবিঃ সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের তৈরি ভুল গোয়েন্দা তথ্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। একটি চীনা জাহাজে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির উপকরণ রয়েছে, এমন ভুল তথ্যের ভিত্তিতে জাহাজটি আটকে তাতে তল্লাশি চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। অভিযান শুরুর ঠিক আগে গোয়েন্দা তথ্যটি এআইয়ের সহায়তায় তৈরি এবং তাতে গুরুতর ভুল রয়েছে বলে শনাক্ত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অভিযানটি বাতিল করা হয়।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সূত্রগুলোর একজন ঘটনাটিকে এমন একটি ভুল হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ‘প্রায় একটি যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিল’।

সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের বসন্তে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলার সময় ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে চলাচলকারী একটি চীনা জাহাজে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপকরণ পরিবহন করা হচ্ছে।

এই তথ্য মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ তৈরি করে। এরপর জাহাজটিকে আটকে দেওয়ার জন্য একটি অভিযান প্রস্তুত করা হয়। সশস্ত্র মার্কিন সেনাদের জাহাজে ওঠার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়। একই সময়ে সামরিক বিমানও আকাশে অবস্থান করছিল বলে সিএনএনের সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তবে অভিযান শুরুর একেবারে শেষ পর্যায়ে কর্মকর্তারা গোয়েন্দা প্রতিবেদনটির মূল তথ্য আরও গভীরভাবে যাচাই করেন। তখন বিষয়টি সামনে আসে যে, প্রতিবেদনটি তৈরিতে একজন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের বিশ্লেষক একটি এআই চ্যাটবট ব্যবহার করেছিলেন। আর ওই চ্যাটবট জাহাজটির কার্গো বা পণ্য সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বিশ্লেষক জাহাজটির পণ্যতালিকা বা ম্যানিফেস্টসহ বিভিন্ন তথ্য এআই ব্যবস্থায় ব্যবহার করেছিলেন। এর সঙ্গে উন্মুক্ত উৎসের তথ্য এবং গোয়েন্দা তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। পরে এআই ব্যবস্থা ভুলভাবে সিদ্ধান্ত দেয় যে, জাহাজটিতে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির উপকরণ রয়েছে।

এরপর এআই থেকে পাওয়া ফলাফলকে একটি প্রচলিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কাঠামোয় রূপ দেওয়া হয়। প্রতিবেদনটি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে প্রচারিত হয় এবং সেটিকে কেন্দ্র করেই চীনা জাহাজটির বিরুদ্ধে অভিযান প্রস্তুতি শুরু হয়।

কিন্তু পরে বিষয়টি পর্যালোচনা করতে গিয়ে অভিজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষকেরা দেখতে পান, জাহাজটির কার্গো সম্পর্কে এআইয়ের শনাক্তকরণ সঠিক নয়। সিএনএনের একাধিক প্রতিবেদনে এই ভুলকে এআইয়ের ‘হ্যালুসিনেশন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, অর্থাৎ এআই এমন একটি তথ্য তৈরি করেছিল যার বাস্তব ভিত্তি ছিল না।

এরপর দ্রুত অভিযান বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে একটি চীনা জাহাজে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সরাসরি অভিযান এবং এর জেরে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সংকট এড়ানো সম্ভব হয়।

তবে জাহাজটিতে প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের কার্গো ছিল, তা সিএনএনের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি। সিএনএনের সাংবাদিকদের একজন স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাঁরা জাহাজটির প্রকৃত পণ্য কী ছিল তা নির্ধারণ করতে পারেননি। ফলে ওই জাহাজে কোনো ধরনের অবৈধ বা সংবেদনশীল সামগ্রী ছিল কি না, সেটিও এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী সামরিক পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং অন্যান্য কাজে দ্রুত এআই ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ চলতি বছর সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন কাজে এআই ব্যবহারের পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিয়েছেন। লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও এআই ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।

সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি হলো, বিপুল পরিমাণ তথ্য অল্প সময়ে বিশ্লেষণ করা, সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে এটি মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে চীনের মতো বড় সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এআইকে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে দেখছে।

কিন্তু চীনা জাহাজের ঘটনাটি দেখিয়েছে, এআইয়ের তৈরি তথ্যকে যথাযথ মানবীয় যাচাই ছাড়া সামরিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি করা হলে ঝুঁকি কতটা বড় হতে পারে। সাধারণ কোনো তথ্যের ভুলের তুলনায় যুদ্ধ বা সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে ভুল তথ্যের পরিণতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

এখানে বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, ভুল তথ্যটি কেবল একটি এআই ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। একজন বিশ্লেষক এআইয়ের ফলাফলকে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের রূপ দেওয়ার পর সেটি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সেটির ভিত্তিতে বাস্তব সামরিক অভিযানও প্রস্তুত করা হয়েছিল। অর্থাৎ, এআইয়ের একটি ভুল সিদ্ধান্ত মানুষের যাচাই-বাছাইয়ের কয়েকটি স্তর পেরিয়ে কার্যত সামরিক পদক্ষেপের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল।

আর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ছিল, লক্ষ্যবস্তুটি কোনো সাধারণ জাহাজ নয়, ছিল চীনা একটি জাহাজ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বের দুই বড় সামরিক ও পারমাণবিক শক্তি। এমন পরিস্থিতিতে একটি চীনা জাহাজে মার্কিন সেনাদের ওঠার ঘটনা কেবল একটি স্থানীয় সামরিক অভিযান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকার নিশ্চয়তা ছিল না। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারত।

এই কারণেই ঘটনাটি সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের পাশাপাশি মানুষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, এআই দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারলেও এর তৈরি তথ্য সবসময় নির্ভুল নয়। বিশেষ করে অসম্পূর্ণ, অস্পষ্ট বা পরস্পরবিরোধী তথ্যের ক্ষেত্রে এআই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করতে পারে।

চীনা জাহাজের ঘটনাটিও সেই ঝুঁকির একটি বড় উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে। শেষ মুহূর্তে অভিজ্ঞ বিশ্লেষকেরা মূল তথ্য যাচাই না করলে কী ঘটত, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে সিএনএনের সূত্রগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী, সামরিক বিমান ইতোমধ্যে আকাশে ছিল এবং সশস্ত্র সেনারা জাহাজে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অর্থাৎ ভুল তথ্যটি বাস্তব সামরিক পদক্ষেপের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।

ঘটনাটি একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এনেছে, সামরিক ও গোয়েন্দা ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের জন্য কতটা কঠোর মানবীয় যাচাই, জবাবদিহি এবং নিরাপত্তা কাঠামো প্রয়োজন। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য শুধু আর্থিক ক্ষতি বা একটি ভুল অভিযান নয়, তা কয়েকটি রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সংঘাতেও রূপ নিতে পারে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড প্যাসিফিক এবং পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এই নির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি এমন সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে, যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের কার্যক্রমে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়াচ্ছে।

একটি এআই-নির্ভর ভুল গোয়েন্দা বিশ্লেষণ কীভাবে সামরিক পর্যায়ে পৌঁছে একটি সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, চীনা জাহাজের এই ঘটনা তারই বিরল উদাহরণ। শেষ মুহূর্তে ভুলটি শনাক্ত হওয়ায় অভিযান বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু একই ধরনের ভুল ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ কোনো সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ঘটলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

সূত্রঃ সিএনএন

এই শাখার আরও খবর

যাত্রাবাড়ীতে পরপর পাঁচ ককটেল বিস্ফোরণ, আতঙ্ক

ঢাকার যাত্রাবাড়ী মোড়ে পরপর পাঁচটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার সন্ধ্যায় স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এসব বিস্ফোরণের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে এ ঘটনায়…

কুমিল্লায় অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডে পুলিশের হাতে কিছু ক্লু, জিজ্ঞাসাবাদে একজন

কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীমকে হত্যার ঘটনায় কিছু ক্লু পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে একজনকে আটক করে…

পার্থের সরেন্টো বিচে প্রাণঘাতী হাঙরের হামলায় নিহত ব্যক্তি হিসেবে গ্রেগ ও’নিলের পরিচয় শনাক্ত

অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর পার্থের সরেন্টো বিচে হাঙরের হামলায় নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। নিহত ৬৩ বছর বয়সী গ্রেগ জেমস ও’নিলকে একজন নিবেদিতপ্রাণ পরিবারের মানুষ…

মিরপুরে চলন্ত যাত্রীবাহী বাসে আগুন

ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বরে চলন্ত একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় জমজম টাওয়ারের পাশে শিকড় পরিবহনের একটি বাসে এ আগুন লাগে।…

‘ভাত চুরি’ করে খাওয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা

খুলনায় মেসে ‘ভাত চুরি’ করে খাওয়ার অভিযোগে মো. আজমুল হোসেন (২১) নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার রাতে নগরীর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা…

আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে নিখোঁজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের ছেলের মরদেহ উদ্ধার

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au