ডেঙ্গুর টিকা। ছবিঃ সংগৃহীত
মশাবাহিত প্রাণঘাতী রোগ ডেঙ্গু প্রতিরোধে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য হয়েছে ‘কিউডেঙ্গা’ টিকা। বিশেষ করে বিদেশভ্রমণকারীদের মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়তে থাকায় দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ টিকাটি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। এখন চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বসেই এই টিকা নেওয়া যাবে।
কিউডেঙ্গা টিকা সহজলভ্য হওয়ায় অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যেও স্বস্তি দেখা দিয়েছে। প্রতিবছর ছুটির মৌসুমে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবার নিয়ে দেশে আসেন। কিন্তু বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ব্যাপক প্রাদুর্ভাব এবং এ রোগে মৃত্যুর খবর তাঁদের মধ্যে বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে।
সিডনির লাকেম্বার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইরফান খান বলেন, সামনে দীর্ঘ ছুটিতে সন্তানদের নিয়ে বাংলাদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে সবসময়ই উদ্বেগ কাজ করে। অস্ট্রেলিয়ায় ডেঙ্গুর টিকা পাওয়া যাওয়ায় সেই দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমেছে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সন্তানদের দেশে যাওয়ার আগেই টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
আরেক প্রবাসী সৈয়দ আশরাফ আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ জ্বরের মতো বিষয় নয়, অনেক ক্ষেত্রেই এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। অস্ট্রেলিয়ায় বসে বাংলাদেশে পরিচিতজনদের ডেঙ্গুতে মৃত্যুর খবর শুনতে হয়। তাই দেশে যাওয়ার আগে টিকা নেওয়ার সুযোগ প্রবাসীদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি।
অস্ট্রেলিয়ার টিকাদান–সংক্রান্ত জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চার বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিরা কিউডেঙ্গা টিকা নিতে পারবেন। বিশেষ করে আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ভবিষ্যতে ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় ভ্রমণের পরিকল্পনা রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের জন্য টিকাটি নেওয়ার বিষয়ে জোরালো পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কিউডেঙ্গা টিকা দুই ডোজে দেওয়া হয়। প্রতিটি ডোজের পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫ মিলিলিটার। প্রথম ডোজ নেওয়ার অন্তত ১২ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়।
রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনার্সের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. পিটার মার্কি বলেন, ডেঙ্গুর চারটি পৃথক ধরন রয়েছে। কোনো ব্যক্তি একটি ধরনে আক্রান্ত হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে অন্য ধরনে আক্রান্ত হলে গুরুতর ডেঙ্গু হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এ কারণে ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় দীর্ঘ সময় অবস্থান কিংবা একাধিকবার ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে টিকা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। অস্ট্রেলিয়ায় শনাক্ত হওয়া ডেঙ্গু রোগীদের প্রায় সবাই বিদেশভ্রমণের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে দেশে ফেরেন। দেশটিতে ২০২৪ সালে রেকর্ড ২ হাজার ৩৮১ জন এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৮৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হন।
চিকিৎসকেরা ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভারতের মতো ডেঙ্গুপ্রবণ দেশগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রেও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ও প্রবাসীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষ করে বর্ষা ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার মৌসুমে ভ্রমণকারীদের মশার কামড় এড়িয়ে চলার পাশাপাশি টিকার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
ডেঙ্গুর প্রথম টিকা ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ ২০১৫ সালে অনুমোদন পেলেও এর ব্যবহার ছিল সীমিত। এটি মূলত আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছিল। কিউডেঙ্গার অন্যতম সুবিধা হলো, অতীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হওয়া ব্যক্তিরাও নির্দিষ্ট বয়স ও চিকিৎসাগত বিবেচনায় এই টিকা নিতে পারেন।
বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মূল্যায়নের পর অস্ট্রেলিয়ায় কিউডেঙ্গার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে টিকা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বিশেষ করে ডেঙ্গুপ্রবণ দেশে নিয়মিত যাতায়াতকারী প্রবাসী ও ভ্রমণকারীদের জন্য এটি নতুন একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।