বাংলাদেশ

১৬ দিনে ছয় মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগ, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

  • 6:31 pm - October 26, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৭২ বার
১৬ দিনে ছয় মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশের গাজীপুর, ঢাকার সাভার, কুষ্টিয়া ও পাবনার ছয়টি মাদ্রাসায় ১৬ দিনের মধ্যে শিশুদের ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। গত ৮ থেকে ২৩ অক্টোবরের মধ্যে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় সাত বছর বয়সী শিশুও রয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় শিশুদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চুপ থাকতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, অভিযুক্ত শিক্ষকদের ওপর হামলা, মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। শিশু অধিকারকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শুধু বিক্ষোভ করে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজীপুরের গাছা এলাকায় দারুল হেদায়া কওমি মাদ্রাসার আবাসিক শিক্ষার্থী আট বছর বয়সী এক শিশুকে ১০ থেকে ১২ অক্টোবর টানা তিন রাত ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে শিক্ষক ২৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ অলিউল্লাহ ইসলামের বিরুদ্ধে। শিশুটিকে ঘটনা প্রকাশ না করতে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৩ অক্টোবর শিশুটি তার মাকে বিষয়টি জানালে তিনি মামলা করেন। পরে ২২ অক্টোবর পুলিশ অলিউল্লাহ ইসলাম ও মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সদস্য ৩৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ মিজানকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত আরেক ব্যক্তি ৪৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস শেখ এখনো গ্রেপ্তার হননি।

গাজীপুরের টঙ্গীতে কারিউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার শিক্ষক ৩০ বছর বয়সী মোসলেম আহমেদের বিরুদ্ধে প্রথম শ্রেণির সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, ১৯ অক্টোবর এ ঘটনা ঘটে। কথা বললে মারধরের হুমকি দেওয়ায় শিশুটি তিন দিন মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ রাখে। পরে সে বাবা-মাকে বিষয়টি জানায়। ২১ অক্টোবর স্থানীয় লোকজন মোসলেম আহমেদকে মারধর করলে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে আটক করে। পরদিন শিশুটির বাবা মামলা করেন এবং আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

তবে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আলমাস হোসাইন অভিযোগটিকে মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, হামলাকারীরা শিক্ষকদের মারধর করেছেন, কার্যালয়ে ভাঙচুর চালিয়েছেন এবং ১৭ লাখ টাকা ও পাঁচটি মুঠোফোন লুট করেছেন। শিশুটির বাবা লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও ২৩ অক্টোবর পৃথক মামলা করেছে।

ঢাকার সাভারে একটি মাদ্রাসার মালিক ও প্রধান শিক্ষক ৫০ বছর বয়সী আবদুল বারীর বিরুদ্ধে ২১ অক্টোবর ১৩ বছর বয়সী এক আবাসিক ছাত্রীকে ধর্ষণ এবং ঘটনা প্রকাশ করলে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী ৪০ বছর বয়সী তোহফাকে প্রথমে আটক করা হয়। পরে ২২ অক্টোবর দায়ের করা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নির্যাতনের ঘটনায় সহায়তা করেছিলেন এবং শিশুটিকে হুমকি দিয়েছিলেন। আবদুল বারী এখনো গ্রেপ্তার হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা মাদ্রাসাটিতে ভাঙচুর চালান। আবদুল বারীর স্ত্রী ও ছেলেকে উদ্ধারের সময় পুলিশ সদস্যরাও কিছুক্ষণের জন্য সেখানে আটকা পড়েন। অন্যদিকে, আবদুল বারীর বড় ছেলে মুফতি উমায়ের পৃথক মামলা করে ৭৭ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার চুরি এবং এক কোটি টাকার বেশি ক্ষতিসাধনের অভিযোগ করেছেন।

পাবনার একটি নূরানী মাদ্রাসার শিক্ষক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ প্রামাণিকের বিরুদ্ধে ২২ অক্টোবর এক আবাসিক ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। শিশুটি পালিয়ে গিয়ে স্থানীয় লোকজনকে বিষয়টি জানালে তাঁরা অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর করে পুলিশের কাছে তুলে দেন। শিশুটির পরিবারের করা মামলার পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরদিন ভোরে স্থানীয় বাসিন্দারা মাদ্রাসাটিতে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে দারুল আববার মাদ্রাসার শিক্ষক সাঈদ হোসেন নান্নুর বিরুদ্ধে ১৪ অক্টোবর তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। শিশুটির চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে তিনি পালিয়ে যান। ২০ অক্টোবর শিশুটির মা অভিযোগ দায়ের করেন। পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং ২১ অক্টোবর আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

একই উপজেলার মারকাজুল সুন্নাহ মাদ্রাসার প্রধান ৪০ বছর বয়সী আশিকুল্লাহর বিরুদ্ধে এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ৮ অক্টোবর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে উদ্ধারের সময় হাজারো মানুষ মাদ্রাসাটি ঘিরে ফেলেন। এ সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে আশিকুল্লাহকেও কারাগারে পাঠানো হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এদিকে, শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের এসব অভিযোগকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। রোববার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুক্রবারের খুতবায় ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী কোন কাজ বৈধ এবং কোন কাজ অনুচিত, তা তুলে ধরতে তিনি ইমামদের অনুরোধ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর বিষয়টি জানা রয়েছে এবং নির্যাতন প্রতিরোধে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান মন্ত্রী।

শিশু নির্যাতনের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব সাজেদুর রহমান এক বিবৃতিতে যথাযথ তদন্ত, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার নিন্দা জানান তাঁরা।

মানবাধিকার সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনও মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা জোরদার, নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনি ব্যবস্থা এবং কার্যকর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ভয়, সামাজিক লজ্জা ও চাপের কারণে অনেক শিশু নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারে না। ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। শিশুদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা সালমা আলী বলেন, নির্যাতনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু বিক্ষোভ যথেষ্ট নয়। সরকার এসব ঘটনায় কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সামাজিক চাপ, ভয় এবং পুনরায় নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় অনেক ঘটনা পুলিশ বা আদালত পর্যন্ত পৌঁছায় না। আবাসিক মাদ্রাসায় থাকা ছেলে শিশু, বিশেষ করে এতিম শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত নজরদারি, প্রশিক্ষিত পুলিশ, নিরাপদ আশ্রয়, আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, এসব ঘটনায় মানুষের প্রতিবাদ বাড়ার পেছনে শিশু সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর আস্থার ঘাটতি ভূমিকা রাখতে পারে। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত শিক্ষকেরা স্থানীয়ভাবে আপস, ক্ষমা প্রার্থনা কিংবা ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে পার পেয়ে যেতেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো সমাধান নয় উল্লেখ করে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সুস্থ সম্পর্ক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন অধিকারকর্মীরা। তাঁদের মতে, শিশুদের নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ, প্রশাসন ও সরকারকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

সুত্রঃ The Daily Star

এই শাখার আরও খবর

নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনে দুর্গাপূজা: প্রবাসে বাঙালির সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও প্রজন্মের সেতুবন্ধন

ওটিএন বাংলা, নিউজিল্যান্ড: প্রবাসের মাটিতে দেবী দুর্গার আরাধনা, গান ও নৃত্যের পরিবেশনা আর আপনজনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আনন্দে উৎসবমুখর হয়ে উঠল নিউজিল্যান্ডের ডানেডিন। বাঙালি হিন্দুদের…

শেরে বাংলার জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা

​বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তি, স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—এই দুই ক্ষণজন্মা পুরুষ…

ঢাকায় ব্যবসায়ীকে অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ডিজিএফআইয়ের দুই সদস্যসহ গ্রেপ্তার ৬

ঢাকার মোহাম্মদপুরে এক ব্যবসায়ীকে আটকে রেখে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, মারধর ও অপহরণের অভিযোগে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) দুই সদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।…

বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন কারী তাশরীফ

গাজীপুরের টঙ্গীতে মাদরাসায় চুমু ও থাপ্পড়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেওয়া বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন কারী জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ। গত রোববার (২৫ অক্টোবর) প্রকাশিত…

মক্কার মৃত্যুদণ্ড নিয়ে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নে প্রবাসীদের মানববন্ধন

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সরকারের কূটনৈতিক ভূমিকা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে প্রবাসী অধিকার সংগঠন। বিদেশে বিচারের মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশিদের জন্য…

শাহ আমানত বিমানবন্দরে পৌনে ৩ কোটি টাকার স্বর্ণালংকারসহ যাত্রী আটক

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় দেড় কেজি স্বর্ণালংকারসহ মো. শরীফ (৩০) নামে এক যাত্রীকে আটক করেছে বিমানবন্দর গোয়েন্দা সংস্থা ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। উদ্ধার করা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au