সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।ছবি: সংগৃহীত
জুলাই আন্দোলনের সময় শরীরে নয়টি গুলি লেগে আহত হওয়ার দাবি করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন নূর হোসেন নামের এক যুবক। তবে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, তিনি ওই ঘটনায় আহতই হননি। মামলার সঙ্গে জমা দেওয়া চিকিৎসার কাগজপত্রও ভুয়া বলে তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক উক্যমং রাখাইন আদালতে এ প্রতিবেদন জমা দেন। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাদী ভুয়া চিকিৎসা সনদ দিয়ে মামলা করেছেন। তাই আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে আটজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। তবে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, তাঁদের এ মামলায় নতুন করে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাঁরা আগে থেকেই অন্য মামলায় কারাগারে ছিলেন। পরে তাঁদের এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করেন।
বাদী নূর হোসেনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে উপপরিদর্শক উক্যমং রাখাইন বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে আদালত চাইলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন।
এদিকে ২৭ বছর বয়সী নূর হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
গত বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে তদন্ত প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক মিজানুর রহমান জানান, আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি দেখেছেন এবং বাদীর প্রতি নোটিশ জারির নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ১ ডিসেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান, ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ, সাবেক সহসভাপতি সলিম উল্লাহ পাটোয়ারী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, মিলন হোসেন, মহিলা লীগ নেত্রী ইসরাত জাহান তামান্না ও স্বপ্না খন্দকার।
চিকিৎসার কাগজপত্রে অসংগতি
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নূর হোসেন মামলার এজাহারের সঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেওয়ার কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, তিনি ওই হাসপাতালে কোনো চিকিৎসকের কাছেই চিকিৎসা নেননি।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, মামলার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসার কাগজপত্রগুলো ওই হাসপাতালের নয়। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে দুটি অসংগতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ব্যবস্থাপত্র কম্পিউটারে টাইপ করা হয় না, চিকিৎসকেরা হাতে লিখে থাকেন। অথচ নূর হোসেনের জমা দেওয়া কাগজপত্রে ভিন্ন পদ্ধতি দেখা গেছে।
দ্বিতীয়ত, ওই কাগজে উল্লেখ করা ক্যাশ মেমো নম্বর দিয়ে হাসপাতালে ৫৪ বছর বয়সী আব্দুস সাত্তার নামের একজন চিকিৎসা নিয়েছিলেন। অন্যদিকে ব্যবহৃত পরিচিতি নম্বরের সঙ্গে ৩২ বছর বয়সী জুয়েল নামের আরেক রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নূর হোসেনের চিকিৎসার কাগজপত্র যাচাই করে সেগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-২০২৪-এ আহত ব্যক্তিদের সরকারি গেজেটেও তাঁর নাম পাওয়া যায়নি।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তা মনে করেন, নূর হোসেন প্রকৃতপক্ষে আহত হননি। আহত হওয়ার মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে তিনি মামলা করেছেন। তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মামলার অভিযোগ মিথ্যা বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনজীবীদের বক্তব্য
মামলার আসামি মিলন হোসেনের আইনজীবী এ এইচ এম হাসিবুজ্জামান হাসিব বলেন, শুধু এই মামলাতেই নয়, বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের মামলা হয়েছে। বিষয়টি তাঁরা আদালতে উপস্থাপন করবেন। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপ ও স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে অনেককে মামলায় আসামি করা হয়েছে। এতে বহু নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং কারাভোগ করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, তাঁরা জুলাই আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন এবং এ আন্দোলনে সংঘটিত অপরাধের বিচার চান। তবে প্রকৃত অপরাধীদেরই আইনের আওতায় আনা উচিত। নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
মামলায় আইনজীবী জান্নাতুল বর্ণা সুমির ওকালতনামা ব্যবহার করা হয়েছিল। এ বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা তাঁদের ওকালতনামা ব্যবহার করে মামলা পরিচালনা করেন। জুলাই আন্দোলনের মামলা ঘিরে যে বাণিজ্য হয়নি, তা বলা যাবে না। তবে তিনি নিজে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, অনেক সময় মক্কেলরা আইনজীবীদের কাছে প্রকৃত তথ্য গোপন করেন।
মামলার অভিযোগে যা বলা হয়েছিল
মামলার এজাহারে নূর হোসেন দাবি করেছিলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে তিনি মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ময়ূর ভিলা এলাকায় আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। এ সময় আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও গুলি চালানো হয়।
এজাহার অনুযায়ী, তাঁর পিঠে ছয়টি, বাম পায়ের হাঁটুর ওপর দুটি এবং ডান পায়ের হাঁটুর পাশে একটি গুলি লাগে। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে সড়কে পড়ে যান। এ সময় আসামিরা তাঁকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন বলেও অভিযোগ করা হয়।
পরে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে আসামিদের ভয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে বলে এজাহারে উল্লেখ করেছিলেন নূর হোসেন।
এসব অভিযোগে হত্যাচেষ্টার মামলা হিসেবে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ এখন ওই অভিযোগের সত্যতা পায়নি বলে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত এখনো বাকি।