ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে, এমন প্রত্যাশা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের পর সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন হয়েছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম গত প্রায় এক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। গত এপ্রিলের পর এক দিনে তেলের দামে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় দরপতন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৮ ডলার বা ৮ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ ডলারে দাঁড়ায়। একই হারে কমে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম নেমে আসে প্রায় ৮৮ দশমিক ১২ ডলারে। গত ৭ অক্টোবরের পর এই প্রথম ব্রেন্ট তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নামল।
এর আগে গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৮ ডলারে পৌঁছেছিল। কিন্তু মাত্র তিন কার্যদিবসের ব্যবধানে বড় ধরনের দরপতনে তেলের বাজারে পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ কিছুটা কমে আসার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনকে এই দরপতনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার প্রভাব শিগগিরই ভোক্তা পর্যায়েও পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানি মূল্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডির বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হান জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দেশটিতে পেট্রলের গড় দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের নিচে নেমে আসতে পারে।
তেলের বাজারে এই দরপতনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের অবসানে উদ্যোগী হতে পারেন, এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বাজারে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা কমানোর জন্য ওয়াশিংটন নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীদের একাংশ।
ইরান যুদ্ধের কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। এর প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের জ্বালানি বাজারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টিকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের কারণে পেট্রলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে জনঅসন্তোষ বাড়ানোর অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল।
বুধবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের গড় দাম ছিল গ্যালনপ্রতি ৪ দশমিক ১২ ডলার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর আগের তুলনায় এই দাম ৩৯ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক দরপতন সত্ত্বেও মার্কিন ভোক্তাদের এখনো আগের তুলনায় বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।
শুধু পেট্রল নয়, ডিজেলের বাজারেও বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল ফিউচার্সের দাম প্রায় ৭ শতাংশ কমে গত আগস্টের শেষ দিকের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের কাছে ডিজেলের দামের এই পতন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ পণ্য পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বড় একটি অংশ ডিজেলচালিত যানবাহন ও যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল।
ডিজেলের দাম কমলে পরিবহন ব্যয়ও কমতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহে ট্রাক ও অন্যান্য ডিজেলচালিত যানবাহন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে ডিজেলের দাম বেড়ে গেলে পরিবহন খরচ বাড়ে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের খুচরা মূল্যেও পড়ে। বিপরীতে ডিজেলের দাম কমলে সরবরাহ ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হয়। তবে সেই সুবিধা ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
তেলের বাজারে সাম্প্রতিক এই পতনকে যুদ্ধজনিত সরবরাহ-উদ্বেগ কমার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া, ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর জ্বালানি বাজারের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।
এদিকে কয়েক দিনের ব্যবধানে বড় দরপতন হলেও বছরের শুরুতে থাকা দামের তুলনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখনো প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। ফলে সাম্প্রতিক পতন বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনলেও জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কমে এসেছে, এমনটি বলার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি এবং যুদ্ধের গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করেই আগামী দিনগুলোতে তেলের দামের ওঠানামা নির্ধারিত হবে।